Jakaria Manik

Journalist | Writer | Poet

Jakaria Manik

"Humanity can transform this world into heaven — if it chooses to."

Translate posts to your language:

সমুদয় পৃথিবী সকলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে গেছে ॥ রোহিঙ্গাদের জন্য রাখেনি কিছু


এই গ্রহের মাটি-পানি-আলো-বাতাস ব্যবহারের কোন অধিকার তাঁদের নেই, নেই কোন দাবীও!



⇒ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সাংস্কৃতিক সমিতি’, ‘কুমিল্লা মহিলা সমিতি’ এবং কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়ন’ এর উদ্যোগে সংগ্রহ করা হয় পুরনো বস্ত্রসামগ্রী। 
একটি বড় ট্রাকে করে রওনা দেই উখিয়ার উদ্দেশ্যে। সারারাত সজাগ। চালক আনোয়ার হোসেন এবং সঙ্গী আলম মামার সাথে গল্প করতে করতে যেন স্বল্পতেই পার হয়ে গেলো রাত। পৌঁছি ভোর বেলা।

মাঝারী কুয়াশার সকালে টেনাফের সহকর্মী সংবাদিক রফিকুল ইসলাম মোটরসাইকেলযোগে হাজির হন। তাঁর ডাকে আসেন স্থানীয় আরো দুই যুবক। ভোরে মাত্র একটি টিস্টল-কাম-হোটেল খুলেছে; পথের ধারে, ছোট্ট পরিসরের। প্রধান সড়কের এপাড়-ওপাড় উঁচু-নীচু টিলা-পাহাড়। হাতমুখ ধুয়ে কুয়াশা কাটতেই নজরে এলো নির্মাণাধীন বেশ প্রশস্ত এক সড়ক। সাংবাদিক বন্ধুর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, এশিয়ান হাইওয়ের সাথে মায়ানমারকে সম্পৃক্ত করতে নয়া এই সড়কটি নির্মাণ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নাম- ‘বাংলাদেশ-মায়ানমার ফ্রেন্ডশীপ রোড’। নামটি দেখে সড়কটির দিকে আবার খানিক তাকালাম। মনটা ভরে গেল ‘ফ্রেন্ডশীপ’ শব্দটির সাথে সড়কটি মিলিয়ে দেখে। এমন শব্দ আর এমন সড়ক আমাদের খুবই পছন্দ। কামনা করলাম, মায়ানমারের সাথে বন্ধুত্বটা যেন সত্যিকার ভাবেই টিকে থাকে। প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্ব সৌভাগ্যের লক্ষণ!
ধীর ল’য়ে উদিত সূর্য্য। চারদিক আলোকিত। প্রস্তুতি চলল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাওয়ার। খবর পেয়ে রোহিঙ্গা যুবকরা এগিয়ে আসল। ওরাই মাথায় করে বস্তাগুলো নিয়ে গেল। দায়িত্বশীলদের সহায়তায় একে একে বিতরণ হল মালামাল। মুহুর্তেই যেন তাঁদের মুখের হাসি মিইয়ে গেল। অসীম চাহিদা-অপ্রতুল যোগান।

শেষে পরিদর্শনে বের হলাম সঙ্গীদের নিয়ে। সূর্য্যরে তীর্যক রশ্মি বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বনবিভাগের উঁচু-নীচু টিলা বেয়ে অতিক্রম করছি রোহিঙ্গাদের ছাঁপড়াগুলো। বাঁশের চাটাইয়ে কালো পলিথিন; এর থেকেই বেড়া-চাল। ছাঁপড়াগুলো চার-পাঁচ ফুট উচু। মাথা নুইয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। সবাই যেন বসে আছে অলস; কাজ-কর্ম নেই। তাই বলে’ত ক্ষুধা থেমে থাকবে না। চোখই বলে দেয়, ক্ষুধার্ত মুখ। চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ। কেউ কেউ ঘর-দরজা ঠিকঠাক করছে। নতুন চাল-চুলা তৈরী করছে। রান্না করবে-খাবে কিন্তু কী রান্না করবে, কী খাবে, কখন খাবে তা’ জানে না। যেন এক নতুন সংসার, নতুন জীবন, নতুন দুনিয়া। 

দেখা মিলল শিশুদের। ওরা কেউ একা খেলছে, কেউ’বা দল বেঁধে; মাটি নিয়ে। মাটির তৈরী মানুষ মাটি নিয়েই’ত খেলবে। মানুষ সামাজিক জীব! দল বেঁধেই’ত খেলবে। হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের এই আশ্রয় কেন্দ্রে ওদেরই কেউ কেউ দোকান খুলে বসেছে। পণ্য; ডাল-তেল-নুন-রুটি-বিস্কুট। কোন দোকানে কিছু তরিতরকারিও আছে। একেকটি দোকানে কয়েক শ’ টাকার বেশী মালামাল নেই।

কয়েক জন হকারের দেখা মিলেছে। এরা কাঁধে করে টুকরী নিয়ে এক’দুই টাকার হরেক মাল বিক্রয় করে। নাকফুল, কপালের টিপ, হাতের চুরি, নখ পলিশ, আলতা, কাজল, চিরুনী ইত্যাদি। বেশী টাকার মাল থাকবেই কোথা থেকে। দোকানী আর ক্রেতার একই হাল। কেউ কারো চেয়ে ধনী নয়। এককালে তাঁদের অনেকেরই বাড়ি-ঘর, ধন-সম্পদ ছিল, ছিল জমাজমিও। চোখের পলকেই আজ তাঁরা নি:স্ব, সহায়-সম্বলহীন। ধনে-জনে-গোত্রে-বর্ণে সকলেই একাকার। এই সৃষ্টির ভাগ্যে কোন ভূখন্ড বরাদ্ধ রাখেনি স্রষ্টা। মায়ানমার বলছে, ওরা বাঙ্গালী-বাংলাদেশী; বাংলাদেশ বলছে, ওরা মায়ানমারের নাগরিক। সেখানে টিকতে না পেরে ওরা এসেছে।

রোহিঙ্গরা অত্যন্ত ধর্মপরায়ন। পর্দানশীল নারীরা। অর্থাভাব প্রকট হলেও প্রায় প্রত্যেক নারীই বোরকা পরিহিত। গায়ে-গতরে-পোষাকে অপরিচ্ছন্ন হলেও মার্জিত। একটি টিলায় দেখা মিলল নির্মানাধীণ একটি অসম্পূর্ণ স্থাপনা। গাছ কেটে চারপাশে পালা গাড়া। বেড়া দেয়া হয়েছে সেই কালো পলিথিনে। সহযোগিদের কাছে জানতে চাইলাম, এটি কি? তাঁরা বলল, এখানে রোহিঙ্গারা একটি মসজিদ নির্মাণ করছে।

মসজিদে নামাজ আদায় করলে সওয়াব বেশী। এ সত্য রোহিঙ্গারা জানেন। এই মসজিদটিই হয়তো পৃথিবীর নবীন মসজিদ। ‘নবীন মসজিদ’ এবং এটি তৈরীর প্রেক্ষাপট ভেবে এই মসজিদ ভূমির চারপাশ কয়েক বার ঘুরে দেখলাম। তখন মনে পড়ল, সেই আদি মসজিদের কথা। ‘কাবা’ ঘর। মহান স্রষ্টার নির্দেশে প্রার্থনার জন্য ফেরেশতাগণ কর্তৃক পৃথিবীর কেন্দ্রভূমি মক্কায় নির্মিত মসজিদ। এই মসজিদ আর সেই মসজিদ নির্মাণ সময়ের মধ্যে দুনিয়ায় লক্ষ-কোটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এই মসজিদটির নির্মাণ ইতিহাস হয়তো ভিন্ন ভাবেই লেখা হবে। বনবিভাগের ভূমিতে নির্মাণাধীন মসজিটির নির্মাণ কাজ কবে সম্পন্ন হবে, কবে থেকে এখানে বসে তাঁদের মনের দু:খ-অসহায়ত্বের কথা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে বিনাবাঁধায় মনখুলে বলতে পারবে; যে মর্মবেদনা এতো বড় দুনিয়ার কোন মানুষ শুনতে চায় না, তা’ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর কারন হিসেবে জানা গেলো, তাঁদের পেটে খাদ্যের কনাটুকুও নেই। ব্যয়ভার বহণ করে মসজিদ গড়বে কেমন করে। তাহলে আর যাই হোক, শুরুটাতো হলো।
সন্তান-স্বজন-সম্মান-সম্পদ হারানোর রোদন হয়তো স্রষ্টার কাছে এতোকাল পৌঁছেনি। নবীন এই মসজিদে বসে পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে কপাল ঠুকে বুক ফাঁটা কান্নার আওয়াজ এবার হয়তো যথাস্থানে পৌঁছবে, হৃদয়ের গভীর ক্ষত মিইয়ে যাবে, উত্তপ্ত কলিজা ঠান্ডা হবে।
রোহিঙ্গাদের জীবন-চরিত নিয়ে আলাপকালে সহকর্মীরা জানালো আরো পিলেচমকানো কথা। মানায়নমারে ওরা এতোটাই সুবিধা বঞ্চিত ছিল যে, অনবরত ক্ষুধার জ্বালায় তাঁরা সবুজ যে কোন কঁচি লতা-পাতাই খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখানে এসেও তাঁরা ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলে গিয়ে লতা-পাতা নিয়ে এসে খায়। কালের স্বাক্ষী ‘নাফ নদী’তে শামুক-ঝিনুক আর মাথা মোটা এক প্রকার মাছ সহজলভ্য। বোমার মতো দেখা যায় বলে এই মাছটিকে তাঁরা ‘বোম মাছ’ বলে। এই মাছটি দেখলে মনে ভয় জাগে। রোহিঙ্গারা নদীর সেই শামুক-ঝিনুক আর মাথা মোটা বোম মাছ নিয়ে এসে সেগুলো এখনো খায়, বেঁচে থাকার মানসে। এভাবেই চলছে তাঁদের জীবন। জীবনের মর্ম তাঁরা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে। সূর্যোর আলো এখনো তাঁদের কাছে পৌঁছে, ছাঁয়ার প্রলোভনে প্রখর রৌদ্রতাপ এখনো মেঘে ঢাকে তাঁদের. চন্দ্রকিরণ এখানো তাঁদের শোভা দেয়ার চেষ্টা করে। সভ্য পৃথিবী আর অতিআধুনিকতা যেন তাঁদের কাছে শুধুই রসিকতা। যে পৃথিবী তাঁদেরকে মাটিতে পা’ ফেলার স্থানটুকু দেয় না। তাঁরা যেন কোন ভিন্ গ্রহ থেকে আগত কোন অচিন জীব। সমুদয় পৃথিবী সকলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে গেছে। এই গ্রহের মাটি-পানি-আলো-বাতাস ব্যবহারের কোন অধিকার তাঁদের নেই, নেই কোন দাবীও। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ক্ষুদ্রতম কোন একটি প্রাণীও এই গ্রহে স্বাধীনমত বসবাসের অধিকার রাখে। অথচ সেই প্রাণীর মূল্যটুকুও তাঁদের নেই। স্রষ্টার শ্রেষ্টজীব(!) মানুষকে বঞ্চিত করে স্রষ্টাপ্রদত্ত প্রকৃতিকে ভাগ করে নেয়ার অধিকার রাখে কে? এ ক্ষমতা কে কাকে দিলো। সে যই হোক ভাগ-বন্টনত হয়ে গেছে। আর একই সাথে সবলের চক্রান্তে বন্টন হয়ে গেছে দুনিয়ার সকল দূর্বল মানুষের ভাগ্যও।

দেখা মিললো বেড়ার ঘরের ছোট্ট আকারের একটি পাঠশালার। ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম, সেখানে শিশুরা পাঠগ্রহণে ব্যস্ত। এক রোহিঙ্গা যুবক বিনাবেতনে পাঠদান করছেন। মায়ানমারের নিজস্ব ভাষার কিছু বই আছে শিশুদের হাতে, কতেকের কাছে আছে আমাদের সরকারের দেয়া বিনামূল্যের প্রথম শ্রেণীর বই। এখন ওরা দুই ভাষায়ই পড়াশুনা করছে; রপ্ত করছে স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জণবর্ণ। 

কঁচি কঁচি স্বরে গাইছে, আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালোবসি। সহজ-সরল পথ থেকে ওরা সিটকে পড়লেও এখন সহজ-সরল ছড়া-কবিতাই রপ্ত করছে। বার্মিজ ওদের মাতৃভাষা, এটি ওরা হারাতে চায় না। প্রভূ কখনো যদি দয়া করেন, তাহলে মাতৃভূমিতে ফিরে যাবেন; সেই প্রত্যাশায় হয়তো মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন। আর এই দেশেই যদি থাকতে হয় তাহলে’ত একটি অবলম্বন লাগবে, সেই লক্ষ্যে বিশুদ্ধ বাংলাভাষার চর্চা। 

জন্মসূত্রে যারা বার্মিজ, মাতৃভাষা যাদের বার্মিজ, মাতৃভূমি যাদের বার্মা (মায়ানমার), তাঁরা বাংলাভাষার চর্চা করেই কীভাবে খাঁটি বাঙালী হবেন? এই প্রশ্ন এখন অনেকের মাঝে জাগলেও কালের বিবর্তনে হয়তো আজকের রোহিঙ্গা শিশুদের পরবর্তী প্রজন্মগুলো এক সময় খাঁটি বাঙালীই হয়ে যাবেন। সত্যি সত্যি গাইবেন ‘আমার সোনার বাংলা- আমি তোমায় ভালোবাসি’। তখন হয়তো তাঁরা আর কঁচি লতা-পাতা-শামুক-ঝিনুক আর বোম মাছ খাবেন না। বাঙলা আর বাঙালীর জীবন-চরিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।
কিছু বেসরকারি সংস্থা ওদের কিছু টিনের ঘর করে দিয়েছে। কিছু সৌচাগারও নির্মাণ করে দিয়েছে। তবে, স্বল্প পরিসরে। বেশীর ভাগ লোকেরই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সমস্যা প্রকট।

‘সকল জাতই সৃষ্টি যে তার, এ বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর,
মায়ের ছেলে সবাই সমান, তার কাছে নেই আত্মপর।’

Comments