Jakaria Manik

Journalist | Writer | Poet

Jakaria Manik

"Humanity can transform this world into heaven — if it chooses to."

Translate posts to your language:
Articles Poetry

সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি বেতন-ভাতা!

সেবার মান বাড়বে? দুর্নীতি মুক্ত হবে? টাকা দেবে কে?

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, চলতি অক্টোবরের শেষেই নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী বাড়তি মূল বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। ভাতা আপাতত আগের হারেই চলবে। নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সিদ্ধান্তটি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য বড় একটি আর্থিক দায়।

নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে, তবে বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। সর্বশেষ বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। গত দশ বছরের মূল্যবৃদ্ধির বিচারে সমন্বয়ের যুক্তি অস্বীকার করা কঠিন।

দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী আছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সূত্রে এ অঙ্কে সামান্য ভিন্ন তথ্য এসেছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সরকারের মোট ব্যয় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। নতুন কাঠামোর বাড়তি খরচ কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বাজেটের আগে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা গিয়েছিল। বাজেট প্রস্তাবে আলাদা বরাদ্দ না রেখে অন্য খাতের থোক ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের সংরক্ষিত অর্থ থেকে সংস্থানের কথা বলা হয়। আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের খবরও এসেছে। অর্থাৎ বাড়তি দায় ৩৫ থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে, যা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

সমস্যা রাজস্বের ভিত। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ ৬.১ শতাংশ, আর ফিচের পূর্বাভাস ৩.৫ শতাংশ। সংস্থাটি রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনকেও চ্যালেঞ্জিং মনে করছে। আয় কম হলে ঋণ বাড়বে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট পড়বে। দুটির দায়ই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৫ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য চলতি অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান সীমিত, শিল্পখাত জ্বালানি-বিদ্যুতের ব্যয়চাপে ভুগছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আর প্রবাসী আয়ে প্রত্যাশিত গতি নেই বলে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় নির্দিষ্ট নয়, অথচ বাজারদরের চাপ তাঁদেরও সইতে হবে।

বেতন বাড়লেই সেবা উন্নত হয়, এমন নিশ্চয়তা নেই। বেতনের সঙ্গে কর্মমূল্যায়ন, নাগরিক সেবার সময়সীমা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা যুক্ত হওয়া দরকার। এ ধরনের সংস্কারের স্পষ্ট ঘোষণা এখনো চোখে পড়েনি। ন্যায্য বেতন দুর্নীতির প্রণোদনা কমাতে পারে, তবে একমাত্র সমাধান নয়।ন্যায্য বেতন নির্ধারণ করতে হলে ন্যায্য কাজের, ন্যায্য মন ও মানসিকতার, ন্যায্য চরিত্রের নিশচয়তা আগে প্রয়োজন। দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২৫-এ বাংলাদেশের স্কোর ২৪, আগের বছর ছিল ২৩। ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৩তম সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। টিআইবির মতে, এই সামান্য উন্নতির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব ছিল। রাষ্ট্রসংস্কারে অগ্রগতি না হওয়ায় বাস্তবে বড় পরিবর্তন আসেনি। সুতরাং বেতন বৃদ্ধিই দুর্নীতি কমাবে, এর পক্ষে এখনো প্রমাণ নেই। এর জন্য দরকার স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা, সম্পদ-বিবরণীর যাচাই ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা।

বেতন বৃদ্ধির দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সীমিত রাজস্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল সুশাসনের বাস্তবতায় এ ব্যয় তখনই ন্যায্য হবে, যখন তার বিনিময়ে সেবার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। নইলে সুবিধা পাবে একটি অংশ, আর খরচ বইবে পুরো দেশ। অর্থের উৎস, ঋণের প্রভাব ও সংস্কারের পথরেখা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা এখন সরকারের দায়িত্ব।

সূত্র: বিবিএস (মূল্যস্ফীতি), বাংলাদেশ ব্যাংক (মুদ্রানীতি), ফিচ রেটিংস, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (সিপিআই ২০২৫), অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।

লেখক: জাকারিয়া মানিক

বৃদ্ধাশ্রম কেন নিরাপদ


বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে, কিন্তু গড় আয়ু বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার জন্য পারিবারিক কাঠামো যখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন বৃদ্ধাশ্রম একটি বাস্তব ও যুক্তিযুক্ত বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি ‘পরিত্যক্ত’ বৃদ্ধদের ঠাঁই। কিন্তু আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম আর সেই পুরনো চিত্র এক নয়। আজকের বৃদ্ধাশ্রম হলো- একটি পেশাদারি, নিয়ন্ত্রিত ও মানবিক পরিবেশ। যেখানে স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়ে বয়োবৃদ্ধদের জীবন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা হয়।

২৪ ঘণ্টা পরিচর্যা:
বয়স্কদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হতে পারে। (Harvard Health) হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং- এর তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সার্বক্ষণিক নিবন্ধিত নার্স উপস্থিত থাকেন, যারা দক্ষ নার্সিং সেবা প্রদান করেন। এটি বাড়িতে থাকা অবস্থায় প্রায়শই সম্ভব হয় না, বিশেষ করে যখন পরিবারের সদস্যরা কর্মজীবী হন।

ঔষধ পরিচালনার নিরাপত্তা:
যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক সংস্থা ‘জাতীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি’র এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৃদ্ধাশ্রমের ৯১% বাসিন্দা প্রতিদিন ৫টির বেশি ওষুধ গ্রহণ করেন এবং ৬৫% বাসিন্দা ১০টির বেশি ওষুধ নেন। এত ওষুধ একসাথে নেওয়াকে "পলিফার্মেসি" বলা হয়, যা ঘরে বসে ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত জটিল। বৃদ্ধাশ্রমে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট প্রতি মাসে প্রত্যেক বাসিন্দার ওষুধের তালিকা পর্যালোচনা করেন, যা ওষুধের ভুল (medication error) কমাতে সাহায্য করে। উৎস: NCBI (National Center for Biotechnology Information), যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় জীবপ্রযুক্তি তথ্যকেন্দ্র।

পতন প্রতিরোধ ও শারীরিক নিরাপত্তা:
বয়স্কদের জন্য পতন (falls) একটি প্রধান ঝুঁকি। বৃদ্ধাশ্রমগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়- যাতে করিডোরে হ্যান্ডরেল থাকে, মেঝে অস্করোধক (non-slip) হয় এবং বাথরুমগুলো সহজ প্রবেশযোগ্য হয়। এছাড়া, ফিজিওথেরাপিস্ট ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নিয়মিত শরীরচর্চা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা করেন।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ:
কোভিড-১৯ মহামারীর পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্না, হ্যান্ড হাইজিন প্রোটোকল এবং টিকা কর্মসূচি (ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোকোকাল) পরিচালিত হয়, যা ব্যক্তিগত বাসস্থানে অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

গেরোন্টোলজি:
গেরোন্টোলজি (Gerontology) হলো বয়স্কদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে অধ্যয়নরত বিজ্ঞান। আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম এই বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, বয়স্কদের জন্য আলোর তীব্রতা, শব্দের মাত্রা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নির্দিষ্ট মানে রাখা হয়। কারণ তাদের ত্বক, চোখ ও শ্রবণশক্তি পরিবর্তিত হয়।

বয়স-বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা:
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন সংস্থা (Institute for Healthcare Improvement) এর ‘Age-Friendly Health Systems’ কাঠামোতে চারটি মূল বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় যা‘৪এম’ নামে পরিচিত।
1. What Matters (কী গুরুত্বপূর্ণ): প্রত্যেক বয়স্ক ব্যক্তির জীবনে কী গুরুত্বপূর্ণ তা জেনে সেই অনুযায়ী যত্ন পরিকল্পনা করা।
2. Medication (ওষুধ): অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করা (deprescribing) এবং শুধু প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করা।
3. Mentation (মানসিক স্বাস্থ্য): ডিমেনশিয়া ও বিষণ্ণতা সনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা।
4. Mobility (চলাফেরা): নিরাপদে চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখা।

ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড ও সিদ্ধান্ত:
আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে ইলেকট্রনিক মেডিকেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেকর্ড (eMAR) ব্যবহার করা হয়। যা ওষুধ দেওয়ার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডকুমেন্ট করে। এটি মানবিক ত্রুটি কমায় এবং ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন সতর্কতা প্রদান করে।

গবেষণা ভিত্তিক পুষ্টি ও ব্যায়াম:
বয়স্কদের পেশীভর (muscle mass) হ্রাস পায়— একে সারকোপেনিয়া বলে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত প্রতিরোধ ব্যায়াম (resistance exercise) ও প্রোটিনযুক্ত খাবার এই প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। বৃদ্ধাশ্রমে নিউট্রিশনিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্টের উপস্থিতি এই বিজ্ঞানকে কার্যকরী করে।

মর্যাদা ও যত্নের নীতি:
মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর ‘চাহিদার স্তর’ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের দ্বিতীয় স্তরের চাহিদা হলো নিরাপত্তা ও নিরাপদ আশ্রয়। এই তত্ত্বের আলোকে বৃদ্ধাশ্রমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বৃদ্ধাশ্রম শুধু শারীরিক নিরাপত্তা দেয় না, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাও প্রদান করে।

সমন্বয়:
একটি সাধারণ দার্শনিক দ্বন্দ্ব হলো— বয়স্কদর কতটুকু স্বাধীনতা দেওয়া হবে এবং কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। দার্শনিকদের মতে, বৃদ্ধাশ্রমের উচিত ‘সম্পর্ক-ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন’ (relational autonomy) প্রচলন করা। অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বয়স্কদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, কিন্তু পেশাদারদের পরামর্শক হিসেবে রাখা।

যত্ন:
দার্শনিক ভার্জিনিয়া হেল্ড ও জোয়ান ট্রন্টোর ‘Ethics of Care’ তত্ত্ব অনুযায়ী, যত্ন একটি নৈতিক দায়িত্ব। যা শুধু কাজ নয়, সম্মানও বটে। বৃদ্ধাশ্রমে পেশাদার যত্নকর্তারা এই নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন— যা শুধু শারীরিক সেবা নয়, মানবিক সংযোগও স্থাপন করেন।
একাকীত্ব দূরীকরণ:

দর্শন ও মনোবিজ্ঞান উভয়েই স্বীকার করে যে- মানুষ সামাজিক প্রাণী। বয়স্কদের একাকীত্ব মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে— এটি ধূমপান, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সমতুল্য। বৃদ্ধাশ্রমে সামাজিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সহবসিনীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ এই একাকীত্ব কমায়।
মৃত্যুঞ্জয়ী দর্শন ও শেষ জীবনের যত্ন:

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে ‘বানপ্রস্ত’ ও ‘সন্ন্যাস’ আশ্রমের ধারণা রয়েছে।  যেখানে বয়স্কদের শান্তি ও তপস্যার জন্য আলাদা পরিবেশ দেওয়া হতো। আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমে হসপিস সেবা (end-of-life care) এই দার্শনিক ধারণারই বৈজ্ঞানিক রূপ। যেখানে শেষ দিনগুলো ব্যাথাহীন, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিময় হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৫,০০০-এর বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। Medicare ও Medicaid প্রোগ্রামের মাধ্যমে ফেডারেল সরকার এগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ করে। Nursing Home Compare ওয়েবসাইটে প্রতিটি বৃদ্ধাশ্রমকে ৫ তারকা স্কেলে রেটিং দেওয়া হয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার প্রায় ১০শতাংশ বৃদ্ধ রয়েছেন এবং বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে প্রায় সাড়ে ৬শ’। ভারতে প্রাং ১৭ কোটি লোক বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার। বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল। ভারতে যদিও সংখ্যাটি বেশি, কিন্তু ১৭ কোটির বেশি বয়স্ক মানুষের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। উভয় দেশেই বৃদ্ধাশ্রমের মান, নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশগম্যতা নিয়েও চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং উন্নয়নে সরকারের তেমন কোন উদ্যোগ নেই।

ওষুধ নিরাপত্তায় উন্নতি: গবেষণায় দেখা গেছে, বৃদ্ধাশ্রমে ফার্মাসিস্টের হস্তক্ষেপের ফলে অনুপযুক্ত ওষুধের ব্যবহার কমে যায় এবং বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ফলাফল উন্নত হয়। ‘Deprescribing’ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ডিমেনশিয়া যত্নে অগ্রগতি: যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ফেডারেল সংস্থা Centers for Medicare & Medicaid Services এর ‘National Partnership to Improve Dementia Care’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডিমেনশিয়া রোগীদের উপর অ্যান্টিপসাইকোটিক ওষুধের অপব্যবহার কমানো হয়েছে। এর পরিবর্তে নন-ফার্মাকোলজিকাল পদ্ধতি যেমন- সঙ্গীত থেরাপি, স্মৃতিচারণ (reminiscence therapy) ও স্পর্শ যত্ন প্রচলিত হচ্ছে।

বৃদ্ধাশ্রম কি সত্যিই নিরাপদ?
সরকারের নিয়ন্ত্রণের অভাবের বৃদ্ধাশ্রমে অবহেলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু এটি বৃদ্ধাশ্রম ধারণার দোষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা— যেমন ‘ফডারেল ইনস্পেকশন’, ‘ওমবাডসম্যান প্রোগ্রাম’ ও ‘ডিজিটাল মনিটরিং’ এই সমস্যা সমাধান করছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভালো বৃদ্ধাশ্রম বেছে নেওয়া। যা লাইসেন্সপ্রাপ্ত, স্বচ্ছ এবং পেশাদারি মানদণ্ড মেনে চলে।

বাড়িতে থাকাই ভালো?
বাড়িতে থাকা মানসিকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও, গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, একাকীত্ব ও যত্নের অভাব বাড়িতেও বিপজ্জনক হতে পারে। প্রশ্ন হলো ‘বাড়ি না বৃদ্ধাশ্রম? কোথায় বয়স্ক ব্যক্তিটি সবচেয়ে নিরাপদ ও সুখী থাকবেন? বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিটি পরিবারে থাকার ফলে কোন একজন সদস্যর বিরক্তির কারন হতে পারেন। এতে করে পরিবারের সদস্যদের মাঝে একে অপরকে নিয়ে তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে। জীবনের শেষ সময়ে বৃদ্ধ ব্যক্তিটি যদি দেখতে পান পরিবারে তিনি অবহেলার শিকার, অপ্রয়োজনীয় ও একজন অতিরিক্ত সদস্য; তখন তিনি হতাশা ও চরম দু:খের মাঝেই দিনাতিপাত করবেন এবং জীবন-সংসার-সন্তান তথা মানবজীবনকে নিরর্থক মনে করবেন।

পরিবারের ভূমিকা কি শেষ?
না, পরিবারের ভূমিকা শেষ নয় । বৃদ্ধাশ্রম পরিবারকে প্রতিস্থাপন করে না বরং সম্পূরক করে। পরিবার সদস্যরা নিয়মিত দেখা করতে পারেন, যত্নকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেন এবং বয়স্ক ব্যক্তির মানসিক সমর্থন দিতে পারেন। বৃদ্ধাশ্রম শারীরিক যত্ন দেয়, পরিবার ভালোবাসা দেয়। উভয়ের সমন্বয়েই পূর্ণতা আসে। পরিবারের সু:খ ও শান্তির কথা বিবেচনায় বৃদ্ধদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম হতে পারে উত্তম আশ্রয়স্থল। যদিও আবেগের কারনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আশ্রয়স্থল হিসেবে বৃদ্ধাশ্রমকে অস্বাভাবিক মনে করেন এবং নেতিবাচকভাবে এটিকে উপস্থাপন করে থাকেন। 

নিরাপত্তার ত্রিমুখী স্তম্ভ:
বয়স্ক লোকদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম নিরাপদ এই কারণে যে- 
স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা: ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, পতন প্রতিরোধ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞানের নিরাপত্তা: প্রমাণভিত্তিক যত্ন, প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়।
দর্শনের নিরাপত্তা: মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন, সামাজিক সংযোগ ও শেষ জীবনের শান্তির মাধ্যমে মানবিক নিরাপত্তা প্রদান করা হয়।

বৃদ্ধাশ্রম কোনো ‘পরিত্যক্তদের ঠাঁই’ নয়। এটি একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান। যেখানে বয়স্কদের জীবনের শেষ পর্যায়টুকু নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এসেছে। বৃদ্ধাশ্রমকে আমাদের দেখতে হবে একটি ‘জীবনমান উন্নয়ন কেন্দ্র’ হিসেবে। যেখানে স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও দর্শন একত্রিত হয়ে মানবিকতার সেবা করে।

লেখক: জাকারিয়া মানিক

সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কেন এতো অসভ্য হয়ে গেছে?

alt="সোশ্যাল মিডিয়ায় অসভ্যতা"
গতকাল ফেসবুকে একটি নিরীহ পোস্ট দেখলাম। একজন গ্রামের মানুষ জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভালো হাসপাতাল কোনটি?" কমেন্টে ঝাঁকড়ি লেগে গেল। কেউ বললেন, "তুমি বোধহয় পৃথিবীতে নতুন এসেছো।" কেউ বললেন, "এতো বোকা মানুষ!" কেউ আবার ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে গেলেন। আমি ভাবলাম, এই মানুষগুলো কি রাস্তায় কাউকে এভাবে কথা বলতে পারেন? নিশ্চয়ই পারবেন না। তাহলে স্ক্রিনের ওপারে এসে কেন এতো পরিবর্তন? মুখোশের আড়ালে আসল চেহারা: জীবনে আমরা দুটি মুখোশ পরে চলি। একটি বাস্তব জগতের, অন্যটি ভার্চুয়াল। বাস্তবে আমাদের চেহারা, গলার স্বর, চোখের দিকে তাকানো — সবকিছু দায়বদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু অনলাইনে সেই দায়বদ্ধতা নেই। একজন ড্রাইভার রাস্তায় হঠাৎ থেমে গেলে আমরা রেগে যাই। কিন্তু মুখোমুখি হলে সেই রাগ প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। অনলাইনে সেই লজ্জার প্রাচীর ভেঙে পড়ে। মানুষ তার আসল চেহারাটা দেখায় — যেটি সে দিনের পর দিন চাপা দিয়ে রেখেছিল। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কোনো মূল্যায়ন পান না। তাঁদের কথা শোনার কেউ নেই। সোশ্যাল মিডিয়া তাঁদের একটি মঞ্চ দেয় — যেখানে তিনি "কেউ" হয়ে ওঠেন। সেই ক্ষমতাবোধ, তাঁকে অসভ্য করে তোলে। কারণ তিনি ভাবেন, "অবশেষে আমি কিছু বলতে পারছি"। অসভ্যতা অনেক সময় অপরিচিত ক্ষমতার অপব্যবহারের দিকে নিয়ে যায়। যে মানুষ বাস্তবে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে, সে ভার্চুয়াল জগতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্য অসভ্যতাকে হাতিয়ার বানায়। মস্তিষ্ক যেভাবে প্রতারিত হয়: মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন "Online Disinhibition Effect" — অর্থাৎ অনলাইনে মানুষের নিয়ন্ত্রণমূলক শক্তি কমে যায়। প্রশ্ন কেন? প্রথমত- আমাদের মস্তিষ্কে একটি অংশ আছে — Prefrontal Cortex। এটি আমাদের বলে, "এই কথাটি বলা উচিত নয়, কারণ সে কষ্ট পাবে।" কিন্তু যখন আমরা অনলাইনে কাউকে দেখি না, তখন মস্তিষ্কের সেই অংশ কম সক্রিয় হয়। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, চোখের পানি — এসব দেখা না গেলে, আমাদের সহানুভূতির হরমোন অক্সিটোসিন কম নিঃসরিত হয়। ফলে আমরা নিষ্ঠুর হয়ে উঠি। দ্বিতীয়ত- ডোপামিন। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার — এগুলো মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ঝগড়া-বিতর্কিত পোস্টে বেশি এঙ্গেজমেন্ট হয়। তাই মস্তিষ্ক শিখে যায় — "অসভ্য হলে বেশি প্রতিক্রিয়া পাই।" এবং মানুষ সেই নেশায় মত্ত হয়। তৃতীয়ত, Deindividuation। মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণা — যখন মানুষ একটি গোষ্ঠীর অংশ হয় এবং তার ব্যক্তিগত পরিচয় লুকায়, তখন সে এমন কিছু করে যা একা করতো না। সোশ্যাল মিডিয়া কমেন্ট সেকশন একটি ভার্চুয়াল গোষ্ঠী। সেখানে "জনতা" হয়ে গিয়ে মানুষ ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে যায়। অসভ্যতা শুধু চরিত্রের দুর্বলতা নয় — এটি মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক এবং মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াও। তা বোঝা গেলে, আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। জিহ্বা ও আঙ্গুলের যিম্মাদারি: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। আর যে ব্যক্তি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।" (বুখারি, মুসলিম) এই শিক্ষা শুধু মুখের কথার জন্য নয় — লেখার জন্যও। কারণ, কলম (আজকের দিনে কিবোর্ড) যে কথা লেখে, সেটিও তার হিসেবের বইতে লিপিবদ্ধ হবে। আমরা যখন অনলাইনে কাউকে অপমান করি, ভুলে যাই যে সেই কথাগুলোও লিখিত হিসেবে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। স্ক্রিনের ওপারের মানুষটি যদি কাঁদে, যদি হতাশায় ডুবে যায় — সেই গুনাহের ভার আমার উপরও বর্তায়। কারণ ধর্ম শেখায়, "মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের প্রতি রহমত, দয়া ও সহানুভূতি প্রত্যাশিত।" অনলাইনেও আমরা আল্লাহর দৃষ্টিতে আছি। একটি কমেন্টও হিসেবের বাইরে নয়। ভদ্র থাকা ঈমানের অঙ্গ। অপর"কে মানুষ হিসেবে দেখা: ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, মানুষ তার নির্বাচন দিয়ে নিজেকে গঠন করে। যখন আমরা অনলাইনে কাউকে অসভ্যভাবে উত্তর দিই, তখন আমরা শুধু তাকে কষ্ট দিই না — নিজেদেরও একটি "অসভ্য সত্তা" হিসেবে গড়ে তুলি। জার্মান দার্শনিক কান্ট তার "প্র্যাক্টিক্যাল ক্যাটেগরিক্যাল ইমপারেটিভ" এ বলেছেন "মানুষকে কখনো শুধু একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করো না, সর্বদা একটি উদ্দেশ্য হিসেবে দেখো।" সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা অনেক সময় অন্যকে শুধু "এঙ্গেজমেন্টের উপাদান" হিসেবে দেখি — তার ব্যথা, তার গৌরব, তার মানুষ হওয়ার অধিকার আমরা ভুলে যাই। ভারতীয় দর্শনে "অহিংসা পরমো ধর্মঃ" — অহিংসা সর্বোচ্চ ধর্ম। কিন্তু আজকাল আমরা ভাবি, হিংসা শুধু শারীরিক নয়। একটি কটূক্তি, একটি ব্যঙ্গ, একটি অপমানজনক কমেন্ট — এও মানসিক হিংসা। এও অহিংসার পরিপন্থী। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলতেন, "একমাত্র ভালো হলো জ্ঞান এবং একমাত্র মন্দ হলো অজ্ঞানতা।" অনলাইনে অসভ্যতা অনেক সময় অজ্ঞানতার ফসল। আমরা জানি না, ওই মানুষটির পেছনের গল্প। জানি না, তার লড়াই। তাই সহজেই বিচার করি। প্রতিটি মানুষ একটি সম্পূর্ণ জগৎ। তাকে ছোট করে দেখা মানে, নিজের চিন্তার জগৎকেও ছোট করা। আমরা কী করতে পারি? কোন কমেন্ট লেখার আগে ১০ সেকেন্ড থামুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন — "এই কথাটি কি মুখোমুখি বলতে পারতাম? যদি উত্তর 'না' হয়, তবে লিখব না।" মানুষকে কল্পনা করুন:যাকে আপনি উত্তর দিচ্ছেন, তাকে আপনার সামনে বসা মনে করুন — হয়তো তার চোখে পানি, হয়তো সে আজ হতাশ। কল্পনা করলে, কঠোরতা কমে যায়। লাইকের নেশা ছাড়ুন। আপনার মতামতের মূল্য যেন "লাইকের সংখ্যা" না হয়। সত্যিকারের মানুষ তখনই তৈরি হয়, যখন কেউ দেখছে না, তখনও সে নিজের নীতিতে অটল থাকে। টেক্সটে স্বরভঙ্গি থাকে না। অনেক সময় একটি মজা কটূক্তি মনে হয়। সরাসরি জিজ্ঞেস করুন — "তুমি কি এই অর্থে বলেছ?" তারপর উত্তর দিন। কোন বিষয়ে আপনি বেশি রেগে যান? রাজনীতি? ধর্ম? ব্যক্তিগত সমালোচনা? সেই টপিকে কমেন্ট করার আগে সতর্ক থাকুন। রাগ হলে, লেখা বন্ধ করে দিন। পরে ফিরে আসুন। কেউ যদি আপনার প্রতি অসভ্য হয়, প্রতিশোধ নেবেন না। দার্শনিক বুদ্ধ বলেছিলেন, "ক্ষমা হলো দৃঢ়তার চেয়েও শক্তিশালী।" অথবা চুপ থাকুন — যেমনটি হাদিসে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ডিটক্স নিন:প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় কতক্ষণ সময় কাটান? ৩ ঘণ্টা? ৪ ঘণ্টা? সময় কমান। বই পড়ুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। প্রকৃতির কাছে যান। অসভ্যতা অনেক সময় একাকীত্ব এবং ডিজিটাল অতিরিক্ততার ফসল। ভালো কথা ছড়িয়ে দিন। শুধু সমালোচনা নয়, প্রশংসাও করুন। কারো লেখা ভালো লাগলে বলুন। কারো প্রশ্নের উত্তর দিন সুন্দরভাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভদ্রতার একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে, কেউ তো শুরু করতে হবে। সেই শুরুর মানুষটি হতে পারেন আপনি। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই: দিন শেষে সবচেয়ে কঠিন মানুষের মধ্যেও একটি নরম স্থান আছে। সবচেয়ে রাগী মানুষও, যখন কেউ ভদ্রভাবে কথা বলে, তখন নিজেকে সামলে নেয়। সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী যন্ত্র। এটি পৃথিবীকে জুড়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা যদি এটিকে ঘৃণা, বিষ এবং অসভ্যতার জায়গায় পরিণত করি, তবে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। আমাদের প্রয়োজন "ডিজিটাল মানবতা"— স্ক্রিনের ওপারে যে মানুষটি আছে, তাকেও একজন মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা। ভদ্র থাকুন। অনলাইনেও মানুষ থাকুন। কারণ, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই— এটি আমার বিশ্বাস, এটি বিজ্ঞানের সত্য, এটি ধর্মের শিক্ষা এবং এটি দর্শনের ভাবনা। লেখক: জাকারিয়া মানিক

অজানা শঙ্কা: মানুষের অস্তিত্বের অন্তর্গত ভয়

 

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তায় ঘেরা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পথচলায় সে কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটবে। এই অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নেয় এক অদৃশ্য, অথচ গভীর শক্তি-অজানা শঙ্কা। দৃশ্যমান বিপদের ভয় যেমন সিংহকে সামনে দেখে দৌড়ে পালানো, তেমন নয় এটি। অজানা শঙ্কা অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং মানসিক। এটি মানুষের অন্তরের গোপন কোণে বাস করে এবং তার চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে।



অজানা শঙ্কার স্বরূপ:

অজানা শঙ্কা হলো এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে ভয়ের উৎস স্পষ্ট নয়। মানুষ জানে না ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু একটি অস্বস্তি, অস্থিরতা এবং আতঙ্ক তাকে ঘিরে রাখে। যেমন:

একজন ছাত্র পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই চিন্তিত থাকে — যদি ব্যর্থ হই?

একজন রোগী রিপোর্ট পাওয়ার আগেই কাঁপে — যদি মারাত্মক রোগ ধরা পড়ে?

একজন বাবা উদ্বিগ্ন — আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?

এখানে ভয় দৃশ্যমান কোনো হুমকি থেকে নয়, বরং অজ্ঞাত ভবিষ্যৎ থেকে জন্ম নিয়েছে।

অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কিয়ের্কেগার্ড একে বলেছেন "Existential Angst" বা অস্তিত্বজনিত শঙ্কা। তার মতে, এটি মানুষের অস্তিত্বের একটি স্বাভাবিক অবস্থা, যা সম্পূর্ণ এড়ানো যায় না।

কেন মানুষ অজানা শঙ্কায় ভীত;

১. সীমিত জ্ঞান:

মানুষের জ্ঞান সীমিত, অথচ জগৎ বিশাল এবং জটিল। ভবিষ্যৎ অজানা থাকায় মানুষ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আতঙ্কিত হয়।

যেমন, অন্ধকার ঘরে দাঁড়ানো মানুষ ভয় পায় — কারণ সে দেখতে পায় না সামনে কী আছে। অজানার অন্ধকার মানুষের মনের মধ্যে ভয় জাগায়।

২. নিয়ন্ত্রণহীনতা:

মানুষ তার জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করলেও সবকিছু তার হাতে থাকে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হঠাৎ দুর্ঘটনা, মৃত্যু — এসব মানুষের ইচ্ছার বাইরে ঘটে।

এই নিয়ন্ত্রণহীনতা থেকে জন্ম নেয় অজানা শঙ্কা।

৩. মৃত্যুচেতনা:

মৃত্যু হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অজানা।

মৃত্যুর পর কী ঘটে, সেখানে কি কোনো অস্তিত্ব থাকে — এই প্রশ্নের উত্তর কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।

এই অনিশ্চয়তাই মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

দার্শনিক হাইডেগার এ বিষয়ে বলেছেন-

“মানুষ হলো Being-towards-death” — অর্থাৎ এমন এক সত্তা যা সর্বদা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। এই উপলব্ধিই তার মনে এক অজানা শঙ্কা তৈরি করে।

অজানা শঙ্কার দার্শনিক তাৎপর্য:

অস্তিত্ববাদী দর্শনে অজানা শঙ্কা কেবল ভয় নয়; এটি একটি জাগরণ।

যখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার জীবন অস্থায়ী এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন সে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করে:

আমি কেন বেঁচে আছি?

আমার জীবনের লক্ষ্য কী?

আমি মৃত্যুর আগে কী রেখে যেতে চাই?

এই প্রশ্নগুলোই তাকে সত্যিকার অর্থে অস্তিত্বশীল করে তোলে। কিয়ের্কেগার্ড মনে করতেন, অজানা শঙ্কা মানুষকে পঙ্গু করতে পারে, আবার তাকে মুক্তও করতে পারে।

যে ব্যক্তি সাহসের সঙ্গে শঙ্কার মুখোমুখি হয়, সে নিজের জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তার ভেতরে এক নতুন শক্তি খুঁজে পায়।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি:

ধর্মের আলোকে অজানা শঙ্কা হলো মানুষের ঈমান বা বিশ্বাসের পরীক্ষা। মানুষ জানে না তার ভবিষ্যৎ কী হবে, কারণ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান স্রষ্টাই সব জানেন। এই বিশ্বাস মানুষকে শঙ্কা জয় করতে সাহায্য করে।

কোরআনে বলা হয়েছে:

“যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনি যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩)

ধর্মীয় আস্থা মানুষকে শেখায় যে অনিশ্চয়তার মাঝেও শান্ত থাকা সম্ভব, যদি স্রষ্টার উপর নির্ভরতা থাকে। এভাবে অজানা শঙ্কা ভয় না হয়ে এক প্রকার আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হয়ে উঠতে পারে।

অজানা শঙ্কার ইতিবাচক দিক:

অজানা শঙ্কা সবসময় ক্ষতিকর নয়।বরং এটি মানুষকে সতর্ক হতে এবং প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

পরীক্ষার ভয় ছাত্রকে পড়াশোনায় মনোযোগী করে।

রোগভয় মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করে।

ভবিষ্যতের ভয় মানুষকে সঞ্চয় ও পরিকল্পনা করতে শেখায়।

অতএব, শঙ্কা যদি নিয়ন্ত্রিত থাকে, তবে এটি ধ্বংসের বদলে উন্নতির পথ তৈরি করে।

শঙ্কা মোকাবেলার উপায়:

১. আত্মজ্ঞান: 

নিজের ভেতরের ভয়কে চিনতে শেখা এবং তা স্বীকার করা।

২. বর্তমানে থাকা: 

ভবিষ্যতের অজানা ভয় না করে বর্তমান মুহূর্তে মনোনিবেশ করা।

৩. বিশ্বাস ও আস্থা: 

স্রষ্টার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে ভয়কে শান্ত করা।

৪. দার্শনিক দৃষ্টি: 

শঙ্কাকে শত্রু নয়, শিক্ষক হিসেবে দেখা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা সীমিত, আর সময় অমূল্য।

জগতের প্রতিটি মানুষ অজানা শঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত।এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য।

এই শঙ্কা জন্ম নেয় মানুষের সীমিত জ্ঞান, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং মৃত্যুচেতনা থেকে। যদিও এটি ভয় এবং অস্থিরতা তৈরি করে, তবু সচেতনতা, বিশ্বাস এবং আত্মজ্ঞান দ্বারা মানুষ এই শঙ্কাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। অজানা শঙ্কা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন অস্থায়ী এবং অনিশ্চিত। এই উপলব্ধি মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়, কিভাবে বাঁচতে হবে এবং কী রেখে যেতে হবে।

অতএব, অজানা শঙ্কা শুধুই ভয় নয়; এটি মানুষের আত্ম-অন্বেষণ এবং সত্যের সন্ধানের এক অনিবার্য সঙ্গী।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন: ভালো থাকুন-সুস্থ থাকুন

“কৃতজ্ঞতা স্বীকার” (Gratitude) – এটি শুধু নৈতিক বা আধ্যাত্মিক গুণ নয়, বরং শরীর, মন, সমাজ এবং আত্মার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন– এই তিন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যায়-



বিজ্ঞান মতে (Psychology & Neuroscience)

মস্তিষ্কে পরিবর্তন:

কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসৃত হয়। এগুলো “হ্যাপিনেস কেমিক্যাল” হিসেবে পরিচিত। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমে যায়। ফলে মানসিক চাপ হ্রাস পায়।নিউরোপ্লাস্টিসিটি (মস্তিষ্কের কোষগুলোর নতুন সংযোগ গঠন) বাড়ে, ফলে ইতিবাচক চিন্তা সহজ হয়।

শারীরিক প্রভাব:

রক্তচাপ ও হার্টরেট স্বাভাবিক থাকে। ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হয়। ঘুম ভালো হয়, ক্লান্তি কমে।

মানসিক প্রভাব:

হতাশা, দুঃশ্চিন্তা ও উদ্বেগ কমে। জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান বাড়ে।

ধর্ম মত:

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য নিয়ামত বাড়িয়ে দেব” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৭)। কৃতজ্ঞতা ঈমানকে দৃঢ় করে, হৃদয়ে শান্তি আনে, আল্লাহর রহমত বাড়ায়।

হিন্দুধর্ম মতে কৃতজ্ঞতা ধর্ম (সৎকর্ম) বজায় রাখে। দেব-দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মানেই বিশ্বচক্রে নিজের স্থান স্বীকার করা।

খ্রিস্টধর্মে: বাইবেলে লেখা— “সব বিষয়ে কৃতজ্ঞ হও” (1 Thessalonians 5:18)। কৃতজ্ঞতা আত্মাকে ঈশ্বরের আরো কাছাকাছি নিয়ে যায়।

বৌদ্ধধর্মে: কৃতজ্ঞতা মৈত্রী (মমতা) ও করুণা চর্চা বাড়ায়। এটি অহংকার ভাঙে এবং “অহিংস চিত্ত” জাগায়।

দর্শন মতে:

Stoicism: কৃতজ্ঞতা মানে নিয়তির প্রতি গ্রহণযোগ্যতা (Amor Fati)। যা আছে, তাই মেনে নেওয়া—এটাই মুক্তি।

Existentialism: অস্তিত্ববাদীরা বলেন, কৃতজ্ঞতা মানে নিজের স্বাধীনতা ও জীবনের অস্থায়ী অর্থ খুঁজে পাওয়া। কৃতজ্ঞ হওয়া মানে “শূন্যতা”র ভেতরেও অর্থ তৈরি করা।

Vedanta: আত্মাকে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করার পথ কৃতজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। কৃতজ্ঞতা মানে অহংকার বিলীন হওয়া, “আমি”-এর জায়গায় “আমরা”র উদ্ভব।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে-

শারীরিকভাবে সুস্থ দেহ, ভালো ঘুম, কম স্ট্রেস। মানসিকভাবে প্রশান্তি, ইতিবাচক মনোভাব, আত্মবিশ্বাস। ধর্মীয়ভাবে ঈশ্বরের নৈকট্য, নিয়ামতের বৃদ্ধি, পুণ্য। দার্শনিকভাবে নিয়তি মেনে নেওয়া, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, অহং ভাঙা।

জগতে কারো দুঃখ কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারে না


মানুষ জন্মায় আলোতে,
কিন্তু ছায়া তাকে সর্বদা ঘিরে রাখে।
সুখ ভাগ করা সহজ—
কিন্তু দুঃখ?
দুঃখ হলো অন্তরের নীরব আর্তনাদ,
যেখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।



দুঃখ মানে সেই হাসির আড়ালের দীর্ঘশ্বাস,
যা কেউ শোনে না।
মানুষ হাসিমুখে চলাফেরা করে,
কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়ে নীরবে।
বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কান্না করা যায়,
কিন্তু হৃদয়ের গভীর ক্ষত—
সেটি কেবল ভুক্তভোগীর একান্ত সম্পদ।


বিজ্ঞান বলে—
প্রতিটি মস্তিষ্ক দুঃখকে আলাদাভাবে অনুভব করে।
একই ঘটনার আঘাতে
কারো হৃদয় ভেঙে যায়,
আবার কেউ তা সহজেই মেনে নেয়।
তাই ব্যথা তুলনাহীন,
ব্যক্তিগত, অনন্য।
যন্ত্রণার ভাষা কেবল ভেতরের স্নায়ুতন্ত্রই জানে।


ধর্ম শেখায়—
দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়,
কিন্তু তার ভার বহন করতে হয় নিজেকেই।

কোরআন বলে:
"কোনো প্রাণী অন্য প্রাণীর বোঝা বহন করবে না।"

বাইবেল মনে করায়:
ঈশ্বর হৃদয়ের গোপন বেদনা জানেন।

গীতা উচ্চারণ করে:
কর্মফলের ফল ভোগ করতে হয় প্রত্যেককেই।

বুদ্ধের বাণী প্রতিধ্বনিত হয়—
“জীবন মানেই দুঃখ।”

অতএব ধর্মে বারবারই শোনা যায়—
মানুষের দুঃখ আসলে তারই একান্ত যাত্রা।


অস্তিত্ববাদীরা বলেন—
মানুষ একা জন্মায়,
একা মরে,
এবং দুঃখের পথেও
সে একাকী পথিক।

স্টোয়িকরা শেখান—
দুঃখ বাইরের জিনিস নয়,
বরং ভেতরের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি।

হুসার্ল বলেন—
প্রত্যেক অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত,
তাই দুঃখও অবিচ্ছেদ্যভাবে একান্ত।


মানুষের দুঃখ যেন এক গোপন নদী।
তার তীর দেখা যায়, ঢেউ ছোঁয়া যায়,
কিন্তু গভীর স্রোত?
তা অদৃশ্য—
যেখানে পৌঁছাতে পারে না কেউই।

বন্ধুরা পাশে থাকে,
পরিবার সান্ত্বনা দেয়,
সমাজ সমবেদনা জানায়,
কিন্তু হৃদয়ের প্রকৃত বেদনা
অবশেষে মানুষকেই বহন করতে হয় একা।

জগতে সুখী কোন মানুষ নেই!

 

মানুষ জন্মায় স্বপ্ন নিয়ে, বাঁচে আশার আলোয়, আর মরে যায় অপূর্ণতার ভারে। তবুও প্রতিদিন সে ছুটে চলে সুখের খোঁজে—যেন কোথাও এক অমৃতসুধা আছে, যা একবার পান করতে পারলেই সব ব্যথা, সব তৃষ্ণা মিটে যাবে। কিন্তু সত্য হলো—সুখ কেবল এক মরীচিকা, কাছে গেলেই শূন্যতায় মিলিয়ে যায়।



শৈশবে মনে হয় খেলনাই সুখ, যৌবনে বিশ্বাস করি প্রেম বা সাফল্যই সুখ, প্রৌঢ়ত্বে ভরসা রাখি শান্তি আর নির্ভার জীবনে। কিন্তু বয়স বাড়তে বাড়তে বোঝা যায়—কোনো কিছুই পূর্ণতা আনে না; প্রতিটি অর্জনের আড়ালেই থাকে অন্য কিছুর অভাব।

দর্শনের আলোয় এ সত্য বহুবার ধরা দিয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন বলে, জীবন মানেই দুঃখ; সুখ ক্ষণস্থায়ী। অস্তিত্ববাদী চিন্তা জানায়, মানুষ এক শূন্যতার মাঝে নিক্ষিপ্ত, আর সুখ গড়তে হয় নিজের অর্থ-সৃষ্টি দিয়ে। আবার সুফি দর্শন মনে করায়, দুনিয়া অস্থায়ী, চিরসুখ কেবল স্রষ্টার প্রেম ও স্মরণে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষের মন কখনো তৃপ্ত হয় না। আজ যা চায়, তা পেলে কাল অন্য কিছু চাইবে। তাই সুখ সবসময় সামনে ছুটে চলে, কিন্তু হাতের মুঠোয় ধরা দেয় না।

তবুও মানুষ সুখের খোঁজে ছুটে চলে। কেননা এই খোঁজের ভেতরেই জীবনের আসল সৌন্দর্য। যদি সুখ একদিন সত্যিই ধরা দিত, তবে জীবন থেমে যেত। তাই বলা যায়—

জগতে সুখী কোন মানুষ নেই, তবুও সুখের খোঁজেই মানুষ বেঁচে থাকে।


জগতে নিখুঁত (Perfect) বলতে কিছু নেই


প্রকৃতি: পৃথিবীতে প্রতিটি জিনিসেরই সীমাবদ্ধতা আছে। ফুল ফোটে, ঝরে যায়; মানুষ জন্মায়, বার্ধক্যে পৌঁছে মরে যায়।



মানুষ: আমাদের জ্ঞান, চিন্তা, শরীর, সম্পর্ক—সবকিছুতেই অসম্পূর্ণতা আছে। মানুষ ভুল করে, আবার সেই ভুল থেকেই শেখে।

দর্শন: অস্তিত্ববাদী চিন্তায় বলা হয়, মানুষ নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে নেয় অসম্পূর্ণতার ভেতর দিয়েই। নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা মানুষকে অনন্ত অনুসন্ধানী করে তোলে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়।

সৌন্দর্য: অনেক দার্শনিক মনে করেন, জিনিসের অসম্পূর্ণতাই তার সৌন্দর্যের আসল উৎস। জাপানি দর্শনে Wabi-sabi বলে একটি ধারণা আছে—যেখানে অসম্পূর্ণতা, অস্থায়িত্ব এবং অপূর্ণতার মাঝেই সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়।

অতএব, নিখুঁত না থাকাটা কোনো ঘাটতি নয়, বরং আমাদের জীবনের সত্য এবং সৌন্দর্যের অংশ।


মানুষ তার রাষ্ট্র, অঞ্চল, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবারের প্রতিনিধি

মানুষ কোথায় জন্মগ্রহণ করছে বা তার পরিবেশ কেমন, তা তার নিজের হাতে থাকে না, তবে সে তার কর্মের মাধ্যমে ভালো কিছু করতে পারে। জীবনের পথচলার শুরুতে মানুষ তার পরিবেশ বা জন্মস্থান বেছে নিতে পারে না, কিন্তু কর্মের মাধ্যমে সে তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে এবং দেশের জন্য, সমাজের জন্য, পরিবারের জন্য ভালো কিছু করতে পারে।

মানুষ তার জন্মস্থান,ল সামাজিক প্রেক্ষাপট বা পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কোথায় বা কোন পরিবেশে সে জন্মগ্রহণ করবে, তা তার ইচ্ছাধীন নয়।

মানুষ কর্মের মাধ্যমে তার ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। জন্মস্থানের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, মানুষ তার কাজের মাধ্যমে ভালো কিছু করতে পারে এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

এই প্রবাদটি জীবনের কর্মফল এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তির উপর জোর দেয়। মানুষের জীবনে পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, কর্মের মাধ্যমেই তার জীবনের মান নির্ধারিত হয়।

কর্মের দ্বারাই মানুষ পৃথিবীর বুকে সম্মান ও প্রতিষ্ঠা পায়। কোনো মানুষের জন্ম যে বংশেই হোক না কেন, আপন কর্মই তার পরিচয় নির্ধারণ করে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার রাষ্ট্র, অঞ্চল, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবারের প্রতিনিধি। তাই নিজেকে সুন্দর এবং উত্তম উপস্থাপন করলে নিজের রাষ্ট্র, অঞ্চল, সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবারের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য কেন?

 
দুর্জন মানে খারাপ লোক। খারাপ লোক যতই শিক্ষিত হোক 
না কেন, তার সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত।

সাধারণত চক্রান্তকারী, মিথ্যাবাদী, উগ্র, বদমেজাজি, অসৎ লোককে এককথায় দুর্জন বলা হয়। যারা খারাপ লোক, তাদের কথায়, কাজে ও আচরণে খারাপ স্বভাব প্রকাশ পায়। খারাপ লোক শিক্ষিত হতে পারে, উচ্চশিক্ষিত হতে পারে; আবার নিরক্ষরও হতে পারে। অর্থাৎ কারো খারাপ হওয়ার সঙ্গে শিক্ষিত হওয়া বা না-হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা খারাপ লোকের সঙ্গে মেশে, তাদের সবাই খারাপ লোক মনে করে। এজন্য খারাপ লোকের সঙ্গ ত্যাগ করতে হয় এবং তেমন লোকের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। একসময় এই বিশ্বাস করা হতো - কোনো কোনো বিষধর সাপের মাথায় মণি আছে। কিন্তু মণি আছে বলে সাপের সঙ্গ বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তেমনি দুর্জন লোক শিক্ষিত হলেও তার সঙ্গ পরিত্যাগ করা উচিত। দুর্জন লোক অপরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কখনো পায় না। তার কাছ থেকে সঙ্গীর কিছু শেখার নেই। এমনকি, দুর্জনের কারণে সঙ্গীর বিপদও হতে পারে। বিপরীতভাবে, ভালো লোক নিরক্ষর হলেও তার সঙ্গ প্রীতিকর হয়। ভালো লোকের কাছ থেকে তার সঙ্গীর বিপদ ঘটার সম্ভাবনা থাকে না।

সচ্চরিত্র গঠন করা বিদ্যা অর্জন করার চেয়েও কঠিন কাজ। তাই যিনি চরিত্রবান, সজ্জন  তার বিদ্যা থাক বা না-থাক, তার সঙ্গ প্রত্যাশিত। অন্যদিকে চরিত্রহীন ব্যক্তি বিদ্বান হলেও তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা ক্ষতিকর।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান


(৯৮০-১০৫৩) বৌদ্ধ পন্ডিত, ধর্মগুরু ও দার্শনিক। দশম-একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি পন্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কল্যাণশ্রী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তাঁর বাল্যনাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। মায়ের নিকট এবং স্থানীয় বজ্রাসন বিহারে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বিখ্যাত বৌদ্ধ গুরু জেতারির নিকট বৌদ্ধধর্ম ও শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। এ সময় তিনি সংসারের প্রতি বিরাগবশত গার্হস্থ্যজীবন ত্যাগ করে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের সঙ্কল্প করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণগিরি বিহারে গিয়ে রাহুল গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৌদ্ধশাস্ত্রের আধ্যাত্মিক গুহ্যবিদ্যায় শিক্ষালাভ করে ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ উপাধিতে ভূষিত হন। মগধের ওদন্তপুরী বিহারে মহাসাংঘিক আচার্য শীলরক্ষিতের নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর তাঁর নতুন নামকরণ হয় ‘দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান’। একত্রিশ বছর বয়সে তিনি আচার্য ধর্মরক্ষিত কর্তৃক সর্বশ্রেষ্ঠ ভিক্ষুদের শ্রেণিভুক্ত হন। পরে দীপঙ্কর মগধের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আচার্যদের নিকট কিছুকাল শিক্ষালাভ করে শূন্য থেকে জগতের উৎপত্তি এ তত্ত্ব (শূন্যবাদ) প্রচার করেন।

১০১১ খ্রিস্টাব্দে শতাধিক শিষ্যসহ দীপঙ্কর মালয়দেশের সুবর্ণদ্বীপে গিয়ে আচার্য চন্দ্রকীর্তির নিকট ১২ বছর বৌদ্ধশাস্ত্রের যাবতীয় বিষয় অধ্যয়ন করেন এবং ৪৩ বছর বয়সে মগধে ফিরে আসেন। মগধের তখনকার প্রধান প্রধান পন্ডিতদের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় ও বিতর্ক হয়। বিতর্কে তাঁর বাগ্মিতা, যুক্তি ও পান্ডিত্যের কাছে তাঁরা পরাজিত হন। এভাবে ক্রমশ তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী পন্ডিতের স্বীকৃতি লাভ করেন। এ সময় পালরাজ প্রথম মহীপাল সসম্মানে তাঁকে বিক্রমশিলা (ভাগলপুর, বিহার) মহাবিহারের আচার্যপদে নিযুক্ত করেন। বিক্রমশিলাসহ ওদন্তপুরী ও সোমপুর বিহারে দীপঙ্কর ১৫ বছর অধ্যাপক ও আচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। সোমপুর বিহারে অবস্থানকালেই তিনি মধ্যমকরত্নপ্রদীপ গ্রন্থের অনুবাদ করেন বলে কথিত হয়।এ সময় মহীপালের পুত্র নয়পালের সঙ্গে কলচুরীরাজ লক্ষমীকর্ণের যে যুদ্ধ হয়, দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় তার অবসান ঘটে এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।

এ সময় তিববতের বৌদ্ধ রাজা লাঃ লামা ইয়োসি হোড্ (লাহ্লামা-যে-শেস্) তিববতে বৌদ্ধধর্মের উন্নতি কামনায় দীপঙ্করকে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বর্ণোপহার ও পত্রসহ বিক্রমশীলায় দূত প্রেরণ করেন। দূত জানান যে, দীপঙ্কর তিববতে গেলে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হবে। কিন্তু নির্লোভ নিরহঙ্কার দীপঙ্কর এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাজা লাঃ লামার মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র চ্যাং চুব (চ্যান-চাব) জ্ঞানপ্রভ তিববতের রাজা হন এবং তাঁর একান্ত অনুরোধে ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন বিশিষ্ট পন্ডিতসহ দীপঙ্কর মিত্র বিহারের পথে তিববত যাত্রা করেন। মিত্র বিহারের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকগণ এ দলকে অভ্যর্থনা জানান; পথেও বহু স্থানে তাঁরা অভ্যর্থিত হন। নেপালের রাজা অনন্তকীর্তি দীপঙ্করকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করেন। তিনি সেখানে ‘খান-বিহার’ নামে একটি বিহার স্থাপন করেন এবং নেপালের রাজপুত্র পদ্মপ্রভকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন।

তিববতরাজ চ্যাং চুব দীপঙ্করের শুভাগমন উপলক্ষে এক রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন করেন, যার দৃশ্য সেখানকার একটি মঠের প্রাচীরে আজও আঁকা আছে। সংবর্ধনা উপলক্ষে শুধু দীপঙ্করের উদ্দেশেই ‘রাগদুন’ নামক এক বিশেষ ধরনের বাদ্যযন্ত্র নির্মিত হয়েছিল। এ সময় রাজা চ্যাং চুব প্রজাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন যে, দীপঙ্করকে তিববতের মহাচার্য ও ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করা হবে; বাস্তবে দীপঙ্কর এ সম্মান পেয়েছেনও।

তিববতে থো-লিং বিহার ছিল দীপঙ্করের মূল কর্মকেন্দ্র। এ বিহারে তিনি দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি তিববতের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিববতে বৌদ্ধধর্মের ব্যভিচার দূর হয় এবং বিশুদ্ধ বৌদ্ধধর্মাচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিববতে তিনি মহাযানীয় প্রথায় বৌদ্ধধর্মের সংস্কার সাধন করেন এবং বৌদ্ধ ক-দম্ (গে-লুক) সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তিববতবাসীরা তাঁকে বুদ্ধের পরেই শ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে সম্মান ও পূজা করে এবং মহাপ্রভু (জোবো ছেনপো) হিসেবে মান্য করে। তিববতের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ক্ষমতার অধিকারী লামারা নিজেদের দীপঙ্করের শিষ্য এবং উত্তরাধিকারী বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিববতের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দীপঙ্করের প্রভাব অদ্যাপি বিদ্যমান। তিববতে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি তিববতের একটি নদীতে বাঁধ দিয়ে বন্যা প্রতিরোধের মাধ্যমে জনহিতকর কাজেও অংশগ্রহণ করেন।

দীপঙ্কর তিববতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনীগ্রন্থ, স্তোত্রনামাসহ ত্যঞ্জুর নামে এক বিশাল শাস্ত্রগ্রন্থ সঙ্কলন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তাই অতীত তিববতের যেকোনো বিষয়ের আলোচনা দীপঙ্করকে ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। এসব গ্রন্থ তিববতে ধর্ম প্রচারে সহায়ক হয়েছিল। তিববতে তিনি অনেক সংস্কৃত পুথি আবিষ্কার করেন এবং নিজহাতে সেগুলির প্রতিলিপি তৈরি করে বঙ্গদেশে পাঠান। অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ তিনি ভোট (তিববতি) ভাষায় অনুবাদও করেন। তিববতি ভাষায় তিনি বৌদ্ধশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা এবং কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন বলে তিববতিরা তাঁকে ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর মূল সংস্কৃত ও বাংলা রচনার প্রায় সবগুলিই কালক্রমে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তিববতি ভাষায় সেগুলির অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। তিববতি মহাগ্রন্থ ত্যঞ্জুরে তাঁর ৭৯টি গ্রন্থের তিববতি অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। তাঁর রচিত প্রধান কয়েকটি গ্রন্থ হলো: বোধিপথপ্রদীপ, চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ, সত্যদ্বয়াবতার, বোধিসত্ত্বমান্যাবলি, মধ্যমকরত্নপ্রদীপ, মহাযানপথসাধনসংগ্রহ, শিক্ষাসমুচ্চয় অভিসাম্য, প্রজ্ঞাপারমিতাপিন্ডার্থপ্রদীপ, একবীরসাধন, বিমলরত্নলেখ প্রভৃতি। বিমলরত্নলেখ মূলত মগধরাজ নয়পালের উদ্দেশে লেখা দীপঙ্করের একটি সংস্কৃত চিঠি। চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ নামক গ্রন্থে দীপঙ্কর রচিত অনেকগুলি সংকীর্তনের পদ পাওয়া যায়।

সুদীর্ঘ ১৩ বছর তিববতে অবস্থানের পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৭৩ বছর বয়সে তিববতের লাসা নগরের নিকটস্থ লেথান পল্লীতে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। তাঁর সমাধিস্থল লেথান তিববতিদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুন দীপঙ্করের পবিত্র চিতাভস্ম চীন থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় আনা হয় এবং তা বর্তমানে ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে সংরক্ষিত আছে।  [কানাইলাল রায়]

‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার’- শারমিন জাহান

খতিয়ে দেখতে জনগণের দাবী প্রধানমন্ত্রীর কাছে


সাম্প্রতিক ‘করোনা’ বিশ্ব ব্যাপী প্রাণহরণ করছে। এই প্রাণহরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে! ধনীক শ্রেণী মরছে বেশী! এটি নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা আসছে। ব্যাখ্যা যাই হোক, যে কোন মানুষের মৃত্যু মানুষকে ব্যাথিত করবে। এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এ বারের চিত্রটা একটু ভিন্ন। কিছু মানুষের মৃত্যুতে যেনো অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করছেন। স্বস্তি কেনো? তারা লুটেরা ছিলো। আবার অনেকেই বলেছেন, মৃত্যুর পর এসব বলতে নেই। এর উত্তরে বলছেন, নেই কেন? কতো মানুষকে নি:স্ব করে দিয়ে গেছে, তারা একেক জন ছিলেন জাতীয় মানের প্রতারক-লুটেরা। কারো কারো মৃত্যুতে পাওনাদারের দাবী নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখেছি। নম্রাট-শামীম-পাপিয়া-সাহেদ-সাবরিনাদের গ্রেফতার চিত্র, বিচিত্র উত্থান নাট্য-কাহিনী দেশের মানুষ উপভোগ করছে। মজার-মজার ভারতীয় সিরিয়ালে বিঘ্নতা সৃষ্টি করছিল এইসব খবর। ফেসবুকে চলছিলো লাইক-পোষ্ট-কমেন্ট, সখের-বশে অনেকে বিভিন্ন ভাবে ট্রল করেছিল। এসবের কৃতিত্ব সরকারের থাকলেও কিছু প্রশ্নের সদোত্তর না মেলায় এটি নিয়ে একপ্রকার ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে! দেশের সকল সম্পদের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের মালিক জনগণ! জনগণ এটি বুঝতে পারছে! তাই জনগণের প্রশ্ন অবান্তর বলা যাবে না। দেশের প্রতিটি সেক্টরে ঝেঁকে বসেছে দুবৃত্তায়নচক্র। রাজনীতির দুবৃত্তায়ন রাজনৈতিক মহিমান্বিত ঐতিহ্যকে ঘিরে ফেলেছে। এসবের গোড়া বটবৃক্ষের মতো শক্তপোক্ত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মেঠো কৃষকের মাঝেও এই বিশ্বাস এখন পাকাপোক্ত। একটি দেশের সরকারও যেনো তাদের সাথে কুলিয়ে ওঠতে পারছে না। কিন্তু, কেনো?

দেশে একটি কালভার্টের প্রয়োজন স্থানীয়দের কাছে যতটুকু, এর চেয়েও বেশী যেনো ঠিকাদারের। ঠিকাদার উদ্যোগ না নিলে তা’ হয় না। সমীক্ষা-প্রকল্প তৈরীতে প্রথম থেকেই বিনিয়োগ করতে থাকেন ঠিকাদার। তার পর কাজ পেলে ভাগ-বন্টন! অন্য কেউ পেলে চলে বেচা-বিক্রী। এটি কে না জানে? এসব-তো দেশে প্রকাশ্যেই হচ্ছে! এমন পরিস্থিতিতে ‘শারমিন জাহান’ হতে গেলেন একজন নারী উদ্যোক্তা! ‘অপরাজিতা’! বৈশ্বিক মহামারিতে মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিলেন! তাঁর ব্যক্তিজীবনে কোন দাগ নেই, সয়তানি বলয় থেকেও ছিলেন মুক্ত। সাহস ছিলো অসীম! ঢাবি’তে ছিলেন ছাত্রলীগ নেত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতিক এবং ঢাবি’র সহকারি রেজিষ্ট্রার। উচ্চ শিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন চীনের  উহানে। করোনার হামলায় অভিশপ্ত উহান থেকে তিক্ত  অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। সৎসাহস থাকারই কথা। তাঁর নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। শারমিন জাহান একজন সু-লেখক। তাই তিনি হয়তো সাদাকে সাদা, আর কালোকে কালো দেখেননি। সময় করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যগুলো শুনেননি। সময়ে সময়ে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। চার পাশে শুধুই কালো মেঘের আনাগোনা! রাজাকারের উত্তরসূরীরা জায়গায়-জায়গায় এখনো ক্ষমতাসীন! যারা সর্বদা সুযোগের অপেক্ষায়, পঁচাত্তর পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট তৈরীতে! আওয়ামী লীগের দু:সময়ের কান্ডারীদের সিংহভাগই এখন নি:স্ব; কেউ বা’ চলে গেছেন, কেউ প্রার্থনায় মত্ত। মুজিব কোর্টের দাম কেন বেড়েছে? সে খবর রাখেননি শারমিন জাহান।


স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে জেকেজি-কেকেজি-চামিচ-দা’-বালিশ-কলাগাছ কান্ডের চমকপ্রদ কিছু বিষয় ওঠে আসার পর শারমিন জাহান মনে করেছিলেন, ওকে’ সব ঠিক হয়ে গেছে। সয়তানের দল পালিয়েছে! তাই, তিনি দু:সাহস অর্জন ছাড়াই অসৎচক্রের আস্তানায় আচমকা প্রবেশ করে ফেলেন। শারমিন জাহান চারটি লটে বিএসএমএমইউ’তে মাস্ক সরবরাহ করেন। এর উৎপাদক তিনি ছিলেন না, নিজেই বলেছেন। সরবরাহকৃত মালের কোন মূল্যও তিনি গ্রহণ করেননি। শেষ লটের মাল গ্রহণের ৫ দিন পর প্রশ্ন ওঠে, মালের কোয়ালিটি নিয়ে। তাকে কারন দর্শানের নোটিশ দেয়া হয়। এর জবাবও যথারীতি দিয়েছেন তিনি; বলেছেন, সরবরাহকৃত মালের মান নিয়ে কোন আপত্তি থাকলে তিনি তা’ পরিবর্তন করে দেবেন। এর পর পরই হুট করে থানায় মামলা! রাতেই গ্রেফতার! যারা চালানটি গ্রহণ করলেন, তারা সহজেই দায় এড়াতে পারেন? শারমিন জাহান ভেবেছিলেন, মাল দেবেন টাকা নেবেন! এতো সহজ? কতো পথ পেড়োতে হয়, কতো ঘাটে জল ঢালতে হয়! এটা ছাড়া, কেউ পারেও না করেও না। তো’ তিনি কেন করবেন? তিনি তো আর এই বিদ্যা অর্জন করেননি। হয়তো এটাই হয়েছে তাঁর জন্য কাল। মাফিয়াদের দৌরাত্ব এখন পৃথিবীজুড়ে। মাফিয়াগোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্র পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। প্রভাব বলয় বৃদ্ধির জন্য কখনো কখনো একটি দেশের সরকারকেও বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই মাফিয়াগোষ্ঠী কর্তৃক বড় কিছুকে আড়াল করতে নয়া কিছুর সৃষ্টি সময়ে সময়ে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই হয়। তবে, তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোতে একটু বেশীই হয়। শারমিন জাহান এমনই কিছুর বলি, মনে করছেন অনেকেই। শারমিন জাহানের বেলায় এমন কিছু ঘটেছে কি-না এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহব্বান জানিয়ে আসছেন।

আগেই বলেছি, এই রাষ্ট্র জনগণের। তাই, জনমনে কিছু প্রশ্ন উঠতেই পারে এবং প্রশ্নের উত্তরও প্রত্যাশা করতে পারে। দয়া করে, বিষয়টিকে কেউ অন্যভাবে নেবেন না। শারমিন জাহান কি ভয়ংকর কোন অপরাধী ছিলেন? ভয়ংকর কোন অপরাধীগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন? সুযোগ পেলে তিনি আত্মগোপনে চলে যাবেন, এমন কোন সম্ভবনা ছিলো? তিনি কি দায়িত্বশীল কেউ ছিলেন না? খবরে পেয়েছি, মামলা হওয়ার পর তিনি ঢাকার এক পুলিশকর্তার সাথে মামলা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে যোগাযোগ করেছিলেন। আচ্ছা, মান পরীক্ষা ছাড়া কর্তৃপক্ষ মালগুলো গ্রহণ করলেন কী ভাবে? ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের অগোচরে এ কাজটি করেছেন শারমিন জাহান। বেশ! ‘অগোচর’ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মাল গ্রহণের কয়েক দিন পর প্রশ্ন উত্থাপন করা মানহীন ওই মালগুলো যে শারমিন জাহান কর্তৃক সরবরাহকৃত এটি প্রমাণ করবেন কী ভাবে? মাস্কের গায়ে গায়ে কী শারমিন জাহানের স্বাক্ষর দেয়া ছিল? কর্তৃপক্ষ বলবে, তাই তো? কর্তৃপক্ষের কথা বিশ্বাস করবে কে? এই দেশে কেউ কারো মুখের কথা বিশ্বাস করে? যেখানে মানুষ স্বার্থের প্রয়োজনে চুক্তিপত্র অস্বীকার করে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আগে ভিসা অফিসে ভীড় বেড়েছিল, এটি ভূলে গিয়েছিলেন শারমিন জাহান!
প্রশ্ন ওঠেছিল, ঢাবি’র সহকারি রেজিষ্ট্রার হয়ে বাণিজ্য করেন কী ভাবে? আচ্ছা, জানতে চাই; ঢাবি’র সহকারি রেজিষ্ট্রার হয়ে দেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকেন কী ভাবে? ঢাবি’র হাজার কোটি টাকার কোন উন্নয়ন-সংস্কার কাজে অংশ নেয়ার জন্য শারমিন জাহান কোন ঠিকাদারী লাইসেন্স করে ছিলেন? ঢাবি’র পরিচয়ে মাস্ক সরবরাহে অংশ নিয়েছিলেন? দলের প্রভাব খাটিয়ে কোন দুবৃত্তপরায়ন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন? সকলেই বলবেন না। তাহলে শারমিন জাহান এমন কী অনৈতিক কাজটা করে ফেললেন?


আইনে কি আছে, জানি না। তবে, মানুষ বিশ্বাস করলেই আইন কার্যকর; আইন অন্ধ হলেও মানুষের চোখ বন্ধ করে বেশিক্ষণ রাখা যায় না। শারমিন জাহান বারবার বলতে চেয়েছেন, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। শারমিন জাহানের চালান মাঝপথে বা গ্রহণ করার পর কোনো অসৎচক্র পরিবর্তন করে থাকতে পারেন, এই দেশে এমনটি উড়িয়ে দেয়া যায়? তাই প্রয়োজন এই ঘটনার সঠিক তদন্তের।
এই দেশের চিকিৎসক আমাদের অর্থে গড়া। চিকিৎসক সমাজ সাম্প্রতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। দেশের লক্ষ-কোটি মানুষ চিকিৎসকদের জন্য প্রার্থনা করেছে। চিকিৎসক বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, এটি সকলেই উপলব্দি করতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার পরীক্ষিত এবং আদর্শের সৈনিক শারমিন জাহান পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসক হত্যার কোন মিশনে নেমেছিলেন? না। প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি এঁটেছিলেন শারমিন জাহান? অবশ্যই না। শারমিন জাহান আটকের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর কিছু বক্তব্য প্রচার করেছেন। তবে, তাঁর চরিত্র হনণেরও চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। দেশের সিংহভাগ সংবাদমাধ্যমই এখন পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে নেই। এগুলো কারা পরিচালনা করছেন? কাদের দ্বারা পরিচালিত? আয়ের উৎস কী, তা’ সময়ে সময়ে সাংবাদিকগণই প্রকাশ করেন; যখন ব্যানার নিয়ে রাজপথে নামেন বেতন-ভাতা, পাওয়না টাকা আদায়ের দাবীতে অথবা অনৈতিক কোন কর্মকান্ডের প্রতিবাদে। দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো সঠিক বাংলা উচ্চারণে রিডিং পড়তে পারেন না। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-স্বশিক্ষিত মানুষের হাতে-হাতে এনড্রয়েড মোবাইল ফোন, এটি ভালো! তবে, কে কী কাজে ব্যবহার করছে এর কোন তদারকি আছে? উন্মুক্ত যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, ভুল বানানে বিশ্রী কতো শব্দবাণ। এই ধরণের ভিন্ন মতের কিছু লোক শারমিন জাহানকে নিয়েও কুৎসা রটানোর অপচেষ্টা করছেন। কারো বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য করার আগে ভালো করে যেনে নেয়া সকলেরই প্রয়োজন। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অনেককেই মুখ খুলতে দেখেছি। অনেকেই মন্তব্য করছেন, শারমিন জাহানের বেলায় আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে; অতি-উৎসাহ দেখিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। শারমিন জাহানকে ঢাবি কর্তৃপক্ষ বহিস্কার করেছেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে। তবে, বহিস্কারের আগে এই ঘটনায় তিনি কতটুকু দায়ী তা’ খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রয়োজন ছিলো। জনগণের অর্থে পরিচালিত হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। এটি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়। আর কারো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হলেও রাষ্ট্রের কিছু নিয়ম-নীতি প্রতিপালন করতে হয়। শারমিন জাহান দেশের সম্পদ, তাঁর পেছনেও জনগণের অর্থ ব্যয় হয়েছিল। শারমিন জাহান হয়তো মুক্তি পাবেন। পাবেন না তাঁর হারানো মান। শারমিন জাহানের বক্তব্যগুলো শুনেছি, মনে হয়েছে তিনি হেরে যাবার পাত্রী নন। মন ও মানসিকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত উন্নত। তাঁর মাঝে সততা আছে, তাঁর মনোবল ছিলো অত্যন্ত মজবুত। তিনি লড়াই করেই অবস্থান তৈরী করেছিলেন। শারমিন জাহান হেরে গেলে হেরে যাবেন দেশের সকল নারী উদ্যোক্তা।

জাকারিয়া মানিক
সাংবাদিক ও লেখক
blog.jakariamanik@gmail.com

সুদর্শন ইবলিসের অসাধারণ প্রতিভা

iblis,iblees,İblis,mie iblis,iblis dengan tiga rambut emas,film iblis,islam,iblis movie,iblis filmi,kisah iblis,sumpah iblis,ketemu iblis,istana iblis,iblis əlixan,tanjiro iblis,story of iblis,khutbah iblis,pemburu iblis,əlixan iblis,misteri,resep mie iblis,jibrail & iblis,kekuatan iblis,binatang iblis,dunia bebas iblis,iblis qısa filmi,iblis movie songs,bidadari vs iblis,anime pemburu iblis,resep mie iblis kober

ভয়ে ইবলিসের প্রতি সাধারণ মানুষের মাঝে একটি ধারণা অছে- ইবলিস ভয়ঙ্কর, বীভৎস, কদাকার চেহারার। আসলে তা নয়। ইবলিস ছিল অসাধারণ প্রতিভাবান, খুবই সুদর্শন, সাহসী, শক্তিশালী এবং একঘুঁয়ে। ইবলিসের গৃহশিক্ষকের ছিল শিক্ষকতায় ২৬ হাজার বছরের অভিজ্ঞতা; ইবলিসের মত মেধাবী ছাত্র পেয়ে শিক্ষক ছিলেন গর্বিত। শিক্ষকের অভিমত ছিল, ইবলিস জীবনে বিরাট কিছু একটা হবে।
সময়ের বিবর্তনে জ্বীনদের নোংরা আচরনে অসন্তুষ্ট হয়ে মহান আল্লাহপাক ইবলিসের পিতা হামুচের বংশ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন ফেরেস্তাদের এবং ফেরেস্তাগণ তাই করেন। ইবলিসের দেহ-বর্ণ এবং জ্ঞানের গভীরতা দেখে তাকে রেখে দেন। ইবলিস তার আচরনে ফেরেস্তাদের মন জয় করে। ফেরেস্তারা ইবলিসকে খাশেন (মহাজ্ঞানী) নামক সনদ দেন। পরে ফেরেস্তাগণ তাকে আসমানে তুলে নিলেন। দ্বিতীয় আসমানে ইবলিসের ইবাদত বন্দেগীতে একাগ্রতা দেখে ফেরেস্তাগণ মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘আবেদ’ সনদ দেন। উন্নতি ঘটে তৃতীয় আসমানে। প্রতি আসমানেই তাকে একহাজার বছর ইবাদত করতে হতো এবং সে তাই করতো। এভাবে সে ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম আসমানে পৌঁছে। এবাদত বন্দেগীতে একাগ্রতার উৎকর্ষের সাথে সাথে তার ‘ওলী’, সালেহ, মুত্তাকী, খাজিন, রুহুল্লাহ ইত্যাদি সনদ মিলে। ফেরেস্তাদের আবেদনে আল্লাহপাক ইবলিসকে আরশে মুয়াল্লায় তুলে নেন। সেখানে ইয়াকুত পাথরে নির্মিত সুউচ্চ মিম্বরে বসে সে এবাদত বন্দেগী করতো এবং ফেরেস্তাদের মাঝে ওয়াজ নসিহত করতো। সে লাভ করে মুয়াল্লিমুল মালাকুত বা ফেরেস্তাদের শিক্ষক নামক খেতাব।
এভাবে ছয় হাজার বছর কেটে গেল তার। এতদিনে ভালো জ্বীনদের বংশধরদের দ্বারা পৃথিবী পূর্ণ হয়ে যায়। আর এসব জ্বীনদের ভালোভাবে হেদায়েত করার জন্য পৃথিবীতে আসার নির্দেশ দান করা হয় তাকে। ইবলিস আবেদন করলো, সারাদিন পৃথিবীতে আল্লাহর নির্দেশে কাজ করবে, তবে আরশে মুয়াল্লায় আল্লাহপাকের ইবাদতে রাত যাপনের যেনো সদয় অনুমতি দান করেন। আবেদন মঞ্জুর। ইবলিস আরশে মুয়াল্লায় ইবাদতের পাশাপাশি ফেরেস্তাগণকে নিয়েও মহাণ আল্লাহপাকের গুনকীর্তন করেন। পরে পৃথিবীতে জ্বীনরা ইবলিসের উপদেশাবলী উপক্ষো করতে থাকে এবং যার যার রুচিবোধ অনুযায়ী চলতে থাকে। এতে ইবলিস রাগান্বিত হয়ে জ্বীনদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট আবেদন না করে ধ্বংসের প্রার্থনা করলো। আসমান এবং জমিনে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ইবলিসের সেজদা পড়েনি। তাই তার কোন দরখাস্তই নামঞ্জুর হয়নি।
এরই মাঝে ইবলিসের লওহে মাহফুজ দর্শনের ইচ্ছা পোষণ করলো। হযরত মিকাঈল (আঃ) এর উপর দায়িত্ব পড়লো লওহে মাহফুজ ঘুরিয়ে দেখানোর। লওহে মাহফুজে রয়েছে মহান আল্লাহর সকল সৃষ্টির ভাগ্যলিপি। ইবলিস দেখলো আল্লার এক বান্দা একাধারে ছয়লক্ষ বছর ইবাদত করার পরও আল্লাহর একটি মাত্র আদেশ অমান্যর অপরাধে অভিশপ্ত হয়ে বেহেস্ত হতে বিতাড়িত হবে। স্পষ্ট লেখা “লানা তুল্লাহি আলাল ইবলিস” অর্থাৎ ইবলিসের উপর অভিশাপ বর্ষিত হোক। ইবলিস তখনও জানতো না কে সে অভিশপ্ত। কারন, সে নিজকে সবচেয়ে পূণ্যবান এবং আসমান-জমিনের সকল জ্বীন ও ফেরেস্তাদের অবিসংবাদিত নেতা মনে করতো। অতপর: সে-ই আসমান থেকে বিতারিত এবং অভিশপ্ত। এর পরও আল্লাহপাক তার চারদফা দাবী মঞ্জুর করেন।

যদিও আদম (আঃ) শয়তানের ভয়ে ভীত হলে, আল্লাহ পাক তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন, তুমি ভয় পেওনা। মানুষকে সৎ পথে চলার এবং শয়তানের ধোকা হতে আত্মরক্ষার জন্য আমি তোমার বংশধরদের বিধি বিধান সম্বলিত কিতাব নাযিল করবো এবং নির্দেশিত পথে চালাবার জন্য নবী ও রাসূল প্রেরন করবো।