একবিংশ শতাব্দী সভ্যতার পরিসমাপ্তি টানবে!
‘ওদের বোমাগুলি যদি পারত মরুভূমির মাটি ফাটিয়ে
জলের উৎস ধারা বের করতে,
ওদের ট্যাঙ্কগুলি যদি চষে ফেলত সমস্ত মরুভূমি,
বেয়োনেটের আগায় মাটি খুঁড়ে বুনতে পারত ধান।’
নুরেমবার্গ বিচারসভার মার্কিন প্রধান কৌসুলী রবার্ট জ্যাকসন ১৯৪৬ সালে আন্তর্জাতিক সামরিক বিচার-পরিষদের সামনে দেয়া সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বাস্তবতা এই যে ইতিহাসের দীর্ঘ পদচারণায় বর্তমান শতাব্দী প্রশংসিত অবস্থানে থাকবে না, যদি না এর দ্বিতীয় ভাগ প্রথম ভাগের কালিমা মুছে ফেলে। বিংশ শতাব্দীর এই দুটি ঘটনা ইতিহাসের বইগুলোতে সবচাইতে রক্তাক্ত ঘটনা হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশ্বযুদ্ধ দু’টোতে হতের সংখ্যা প্রাচীন ও মধ্যযুগের সকল যুদ্ধে নিহতের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশী। ইতিহাসের কোনও অর্ধ-শতাব্দী কখনো এই মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখেনি। দেখেনি এমন নিষ্ঠুরতা, এমন অমানবতা, এমন পাইকারি হারে মানুষকে দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা, এমন মাত্রার সংখ্যালঘুর পূর্ণবিলয়। তর্কেমাদার সন্ত্রাসও নাৎসি বিভৎসতার কাছে ফ্যাকাশে লাগে। ভবিষ্যত প্রজন্ম এই দশকগুলোতে ঘটা অনন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণে রাখবে। আমরা যদি এই বর্বরতার পেছনের কারণগুলোকে দূরীভূত করে এর পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে এটা কোনো অতিরঞ্জিত ভবিষ্যত বাণী হবে না; যদি বলা হয় যে, বিংশ শতাব্দী হয়ত সভ্যতারই পরিসমাপ্তি টানবে।’ বিংশ শতাব্দীর বর্বরতার পেছনের কারণগুলোকে দূরীভূত করে এর পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে প্রকৃতিও ফুঁসে উঠছে প্রতিশোধের নেশায়। বিংশ শতাব্দীর নিষ্ঠুরতার এ ধারা অব্যাহত থাকলে একবিংশ শতাব্দী যে সভ্যতার পরিসমাপ্তি টানবে এ নিয়ে এখন কারোরই সন্দেহ নেই।
স্রষ্টার সকল সৃষ্টিই স্রষ্টাপ্রদত্ত নিয়ম/বিধি (ধর্ম) মেনে চলে, সকল প্রাণীর জন্যই স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত তাদের স্বগোত্রীয় প্রতিনিধি বা বার্তা বাহক রয়েছেন। হযরত দাউদ (আ:) এর সুমিষ্ট ‘যাবুর কিতাব’ পাঠ শুনতে সকল জীব-জন্তু এবং মৎস প্রাণীজাত জীবও সমুদ্র কিনারে চলে আসতো। সমুদ্র তীরে বসে তিনি প্রতি শনিবার পবিত্র যবুর পাঠ করতেন। ফলে মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে সে সময় শনিবারে মৎস আহরণ নিষেধ ছিল। হযরত সোলায়মান (আ:) এর নির্দেশে পশুপ্রাণীও কার্য সম্পাদন করতো। এছাড়া ইসলামী ইতিহাস মতে, অনেক ওলি-আউলিয়ার বাহণ ছিলো বিভিন্ন জীব-জন্তু, যেমন বাঘ-সিংহ। ভিন্নতা কেবল মানুষের বেলায়, স্রষ্টাপ্রদত্ত নিয়ম/বিধি (ধর্ম) মেনে চলছে না একমাত্র মানুষ।
পবিত্র কোরআন মতে, আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি বা বার্তা বাহকগণের মধ্যে ১০৪টি আসমানী কিতাব নাজিল হয়েছিল। এছাড়াও বিভিন্ন কালে কালে আরো কিছু মহামানব কর্তৃক আরো কিছু ধর্মের আবির্ভাব হয়েছে। এসকল ধর্মেরই আছে কিছু ধর্মগ্রন্থ। স্বধর্মীয় সম্প্রদায়ের জীবন-বিধান রচিত হয়েছে ওই সকল ধর্মগ্রন্থে। সকল ধর্মই মানবজীবনের জন্য ভালো এবং মন্দ এই দুইটি বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেয়। এই ভালো এবং মন্দ শুধু নিজেরই নয়, সকল মানব সম্প্রদায় এবং স্রষ্টার সকল সৃষ্টির প্রতি। এই শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সকল ধর্মেই ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, রয়েছেন ধর্মীয় দীক্ষাদাতা পীর-মুর্শেদ-গুরু। যদিও প্রকৃতিগতভাবে প্রতিটি মানব সন্তান এই ভালো এবং মন্দবোধ প্রথমেই জনক-জননীর কাছ থেকে পেয়ে থাকেন, যেমনটি পেয়ে থাকে সদ্যজাত প্রাণী সকল। মানুষ ছাড়া অন্য সকল (পবিত্র কোরআন মতে মানুষসহ ১৮ হাজার) প্রাণী (মাখলুক) প্রকৃতিগত শিক্ষা মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত প্রতিপালন করে। কিন্তু বড় বিচিত্র যে, একমাত্র মানব সন্তান ন্যায়-নীতিবোধের এতো পরিচর্যার পরও শিশু-কিশোরকালেই বিপদগামী হয়ে পড়ে। জন্মগতভাবে প্রাপ্ত ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা-আদর্শের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে বেড়িয়ে পড়ে সে। এর জন্য অবশ্য মানবজীবনের চুরান্ত ফায়সালা আল কোরআন মতে, সরাসরি দায়ী করা হয় দুষ্টচক্র শয়তানকে। যেই অভিশপ্ত শয়তানের চক্রান্তে পড়ে মানব সম্প্রদায় আজ পৃথিবীর বুকে। হিন্দু-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চিয়ানসহ অন্যান্য কিছু ধর্মে অবশ্য দুষ্ট রিপুর (শয়তান) কথা বলা হয়েছে। যেই রিপুর তাড়নায় মানব সম্প্রদায় বিপদগামী হয়, সমাজে (স্রস্টার সকল সৃষ্টির) অনিষ্ট করে। মানব সম্প্রদায়ের (কিছু মহাপুরুষ ব্যতিরেকে) অনিষ্ট সাধনে সক্ষম স্রষ্টা কর্তৃক অসীম ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই দুষ্ট রিপু শয়তানের হাত থেকে নিরাপত্তায় ধর্মবেদে বিভিন্ন নিয়ম-রীতির কথা বলা রয়েছে। মানবশিশুও (শয়তানের জারজ সন্তান) জন্ম দিতে সক্ষম মহাপ্রতাপশালী এই শয়তান থেকে নিরাপত্তার সূত্র-বিধান এখন হয়তো অনেকেই ভূলে গেছেন বা মানছেন না। এতেই বেড়েছে বিপত্তি। শয়তানের জারজ সন্তানের আধিক্য হয়তো এখনো হয়নি।
এখন বহুমাত্রিক ধর্মীয় বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে দুনিয়ার সকল মানুষ। এ বিবাদ সকল কালেই ছিল; কখনো কম, কখনো বেশী। তবে বর্তমান সময়ে যেনো এর নয়া মাত্রা পেয়েছে। অশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিতের মধ্যে এই বিবাদ তুলনামুলক বেশী। কোন মানুষকে ধর্মীয় যুক্তিতর্কে বা বিবাদে জড়াতে হলে সাধারণ বিদ্যা-শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে সম্মক একটা ধারণা থাকা প্রয়োজন। পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ধর্ম সংখ্যা ৪ হাজার ৩শ’ প্রায়। এই বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায় সকল ধর্মেই ধর্মীয় গোঁড়ামী (উগ্রপন্থী) রয়েছে। এই উগ্রদের বেশীর ভাগই আবার বয়সে তরুণ-যুবক। এই উগ্রতা শুধু এখনই নয়, সর্বকালেই ছিল। পবিত্র কোরআন মতে, আল্লাহ পাক প্রেরিত ৩শ’ নবীকে হত্যাই করা হয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির পর অস্বাভাবিক মৃত্যু আর ক্ষয়-ক্ষতির সিংহভাগই ধর্মীয় সংঘর্ষে হয়েছে। ধর্মীয় সংঘর্ষ আর উগ্রবাদ পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ি সময়ে সময়ে কেবল ধরণ পাল্টায়। দুনিয়ার প্রতিটি ধর্মেই একটির সাথে আরেকটির কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, নিজেকে উৎকৃষ্ট পরিচয়ে অপরকে আকৃষ্ট করা। ভয়-ভীতি আর শক্তি প্রদর্শনে অপরকে স্বপক্ষে টানা যায়, তবে সে টানের স্থায়ীত্ব বেশী দিন টেকে না। উগ্রতা (উগ্রতার সজ্ঞা এখনো পরিষ্কার নয়) নিজের ধর্মকে শুধু খাটোই করে না, কলঙ্কিতও করে। তবে, পারিপার্শিক দাগকাটা কিছু ঘটনায় কেউ কেউ হয়তো উগ্রপন্থা বেছে নেন। যেমন জাতিগত বা ধর্মীয় কারনে কোন একটি পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নির্যাতন-নিপীড়ণ-হত্যাকান্ডের শিকার হলে ওইসব পরিবারের কেউ সেই শক্তির পতনে হয়ে উঠতে পারে চরম উগ্র। অপরদিকে, স্বধর্মী-স্বজাতির নিপীড়ণে কোন গোষ্ঠী, দল উগ্রপন্থার আশ্রয় নিয়ে থাকেন (কেউ মনে করবেন না, এখানে যুক্তিহীন, দৃষ্টিহীন, উদ্দেশ্যহীন গোঁড়ামীর প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে)। তবে, বর্তমান আধুনিক যুগে ধ্বংশজজ্ঞ সম্পাদন ছাড়া অস্ত্রশস্ত্র এবং কলাকৌশলে অভ্যস্ত কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পেড়ে ওঠার নজির নেই কোন উগ্রপন্থীদের। এমনটি যেনো যেনেশুনেই আগুনে ঝাঁপ দেয়া। বর্তমান বিশ্বে প্রায় শতভাগ লোকই শান্তিকামী। আর শান্তির একমাত্র সূত্র প্রেম। সকল ধর্মেই প্রকৃতিকে ভালোবাসার কথা বলা রয়েছে। দুনিয়ার প্রত্যেকটি মানুষ অন্তত যার যার ধর্ম শতভাগ প্রতিপালন করলে এই গ্রহে কোন একজন মানুষও মানুষ কর্তৃক কোন প্রকার ক্ষতির শিকার হবেন না।
স্রষ্টায় বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধর্মান্তরীত এবং উগ্রপন্থা নিয়ে আজকাল বেশ গবেষণা হচ্ছে। তবে শুধু এসবের জন্যই শুধু নয়, স্রষ্টা-সৃষ্টি-ধর্ম নিয়ে এমনিতেই ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন, পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন প্রয়োজন; অবশেষে নিজের জন্য যা ভালো, পরিবারের জন্য যা ভালো এবং সমাজের জন্য যা ভালো, বুজে-শুনে একজন মানুষের তাই করা উচিত। ধর্ম প্রতিপালনের বিষয়-চর্চার বিষয়; তাই সকল ধর্মেই জ্ঞানার্জনের নির্দেশ রয়েছে। অজ্ঞানীর জন্য সকল ধর্মে সকল মত-পথই রহিত করা হয়েছে। ধর্মীয় বাণী, ‘অজ্ঞানীর ইবাত অপেক্ষা জ্ঞানীর ঘুম উত্তম। জীবন একটাই, দুনিয়া একটাই, সৃষ্টিকর্তাও একজন; দুনিয়ার অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থই বলে, মৃত্যু অবধারিত (জন্ম এবং মৃত্যু নিয়ে কোন নাস্তিকও সন্ধেহ পোষণ করে না), পূণ:জন্মে যারা বিশ্বাস করেন তাঁদের মাঝেও এই বিশ্বাস আছে- মৃত্যুর পর দুনিয়ার পাপ-পূণ্যের হিসেব দিতে হবে এবং সেই হিসাব অনুযায়ি পরকালে (কারো মতে, পরজন্ম) সুখ-দু:খের দায় নিতে হবে।
মানুষ প্রকৃতির প্রতিনিধি। মানুষ বেঁচে থাকলে প্রকৃতি বেঁচে থাকবে। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই ধর্ম (জীবনবিধান) রচিত হয়েছে। একটি ধর্ম আরেকটির পরিমর্জিত সংস্করণ। তাই পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং পরিপূর্ণ সত্য যেখানে আছে শান্তির খোঁজে সেখানেই মানুষের আশ্রয় নেয়া প্রয়োজন। জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো। যে কোন পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং যে যার গর্ভে-ঔরসে জন্ম গ্রহণ করুক না কেন স্রষ্টা-জীবন-জগৎ-ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানার্জন শেষে একজন মানুষকে পরমসত্যাশ্রয়ী হওয়া বাঞ্চনীয়। প্রতিটি মানুষই এক একজন বার্তাবাহক তাঁর নিজ পরিবার এবং উত্তরসূরীর, সমাজ, রাষ্ট্রের এবং দুনিয়ার। তাই প্রত্যেকটি মানুষই এই দুনিয়ার এক একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। অপরকে সুখে রাখা ছাড়া কোন কালেই কেউ সুখী হতে পারেনি। দুনিয়াটাকে সুখী-সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দময় করতে সকল ধর্ম-বর্ণের প্রত্যেকটি মানুষকেই বিশদভাবে যা জানা প্রয়োজন তা’ হলো:
একেশ্বরবাদী ধর্ম ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধান সম্বলিত পবিত্র ৪ আসমানী কিতাব: হযরত মূসা (আ:) এর প্রতি অবতীর্ণ ‘তৌরাত’, হযরত দাউদ (আ:) এর প্রতি অবতীর্ণ ছন্দবদ্ধ ‘যাবুর, হযরত ঈশা (আ:) এর প্রতি অবতীর্ণ ‘ইঞ্জিল’ এবং হযরত মুহম্মদ মোস্তফা (স:) এর প্রতি অবতীর্ণ ছন্দবদ্ধ ‘কোরআন’।
সকল প্রাণী এমনকি পশুপাখিদের প্রতিও যথাযথ করুণা প্রদর্শনের নির্দেশ প্রদানে ‘মানুষ-পশুপাখি সকল প্রাণীই সমভাবে পবিত্র’ এই মূলমন্ত্রে যুগযুগ ধরে ‘মুনি-ঋষি এবং মনীষী’গণের জীবন-জগৎ ও জগতের ¯্রষ্টা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার সমন্বিত রূপে রচিত আদিগ্রন্থ বেদের ওপর ভিত্তি করে ভারত থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত বহুশ্বেরবাদী ‘হিন্দুধর্ম’র (সনাতন ধর্ম) পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘বেদ’ (বৈদিক সাহিত্যের সংহিতা, ব্রাক্ষèণসাহিত্য, আরণ্যক, উপনিষদ), হিন্দুপুরাণ-ভগবদ্গীতা-রামায়ন-মহাভারত-স্মৃতিশাস্ত্র, চরকসংহিতা এবং মনুসংহিতা।
ইরান থেকে ‘জরথ্রুস্ট’ কর্তৃক ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদী ‘জরথুস্ত্রধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘এভেস্টা’।
চীন থেকে ‘কনফুসিয়াস’ কর্তৃক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত অদ্বৈতবাদী ‘কনফুসীয়ধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘লুন-ইউ’।
দু:খ-দু:খের উৎপত্তি-দু:খের নিরোধ-দু:খ নিরোধের উপায় আবিষ্কারক ও প্রচারক রাজপুত্র ‘সিদ্ধার্থ গৌতম’ (গৌতম বুদ্ধ) কর্তৃক ভারত থেকে উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা-মহৎ জীবন ব্যবস্থা-সূক্ষ নীতিবোধের ওপর ভিত্তি করে ৫৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত অদ্বৈতবাদী ‘বৌদ্ধধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’ (বিনয় পিটক, সুত্তপিটক, অভিধম্মপিটক) এবং ‘ভগবান বুদ্ধ’র ১০ পারমি ও চরিয়া পিটক, অষ্টশীল (প্রাণীহত্যা, চৌর্য, ব্যভিচার, মিথ্যাভাষণ, সুরা ও মাদকদ্রব্য সেবন, বৈকালিক ভোজন, নৃত্যগীতি উৎসবাদি দর্শন ও মাল্য সুগন্ধ দ্রব্যাদি দ্বারা অঙ্গলেপন এবং উচ্চশয্যা বা মহাশয্যায় শয়ন থেকে বিরত থাকা)।
ভারত থেকে ‘লাও জে’ কর্তৃক ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত সর্বেশ্বরবাদী ‘তাওবাদধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘তাও-তি-চিং’।
জাপন থেকে ‘বহুজন’ কর্তৃক ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত বহুশ্বেরবাদী ‘শিন্তোধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘কুজিকি’।
‘আহলে তাওহীদ’ (একেশ্বরবাদী মানুষ বা একতাবদ্ধ মানুষ) এবং ‘সৃষ্টিকর্তা মানুষের মাঝে বিরাজ করেন’ এই প্রতিপাদ্যে আরবের (বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল, জর্ডান) সাধু ‘মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল নাশতাকিন আদ-দারাজী’ (১০১৮ খ্রীস্টাব্দে আদ-দারাজী আততায়ীর হাতে নিহত হন) কর্তৃক ১০১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদী ‘দ্রুজধর্ম’র (দ্রুজধর্ম মূলত: শিয়া ইসলামের একটি শাখা) পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘কিতাব আল হিকমাহ’ বা ‘রাসাইল হিকমাহ’।
কায়সাধনায় শরীর নিরোগ ও আধ্যাত্ম সাধনায় অমরত্ব লাভ সম্ভব বলে বিশ্বাসী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ‘মৎস্যেন্দ্রনাথ’ বা ‘মীননাথ’ কর্তৃক ১০ম-১২শ শতকে প্রতিষ্ঠিত নাথধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘নাথসাহিত্য’।
পরিত্রাণের ৪ উপায়; ‘সর্বজীবে দয়া, মিথ্যাকথন থেকে বিরত থাকা, চৌর্যবৃত্তিতে অংশ না নেওয়া, পার্থিব সম্পদ থেকে দূরে থাকা’ এই মূলমন্ত্রে পার্শ্বনাথ ও মহাবীরের শিক্ষা থেকে উৎপত্তি হওয়া ‘জৈনধর্ম। (পরবর্তীতে মহাবীর আরেকটি উপায় সংযোজন করেন, ‘কোন পোষাক পরিধান না করা’। এর স্বপক্ষে যুক্তি: আক্ষরিক অর্থে, আকাশই হচ্ছে আচ্ছাদন। এতে করে জৈনধর্ম দুইটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরে পার্শ্বনাথের অনুসারিদের বলা হয়, শ্বেতবস্ত্র অর্থাৎ সাদা বস্ত্র পরিধান করতে।)
মানবজাতির আত্মিক ঐক্যর (ঈশ্বরে ঐক্য, ধর্মীয় ঐক্য এবং মানবজাতির ঐক্য) উপর ভিত্তি করে ‘বাহাউল্লাহ’ কর্তৃক ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে (বর্তমান ইরান) উৎপত্তি হওয়া একেশ্বরবাদী ‘বাহাইধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘জ্ঞানের বই’। (বাহাই ধর্ম মতে, ইব্রাহিম (আ:), গৌতমবুদ্ধ, যীশু (ঈশা (আ:)), মুহাম্মাদ (সা:) ও অন্যান্য দূতগণ প্রত্যেকেই তাঁদের পরবর্তী দূত আসার ব্যাপারে তাঁদেরকে অনুসরণ করতে বলে গেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিককালে ‘বাহাউল্লাহ’ এর আগমন। ‘বাহাউল্লাহ’ এর আগমনের এক হাজার বছরের মধ্যে আর কোন দূত আসবেন না। ‘বাহাউল্লাহ’র জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে দূতগণের এই ধারা ও পূববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর অঙ্গীকার সম্পূর্ণ হয়েছে। উল্লেখ, বাংলাদেশ ব্রিটিশ ভারতের অংশ থাকাকালে বাহাউল্লাহ’র নির্দেশে এই ধর্ম প্রচারে তাঁর প্রতিনিধি ‘জামাল এফেন্দি’ একাধিকবার ঢাকায় আসেন। তিনি কিছু অনুসারি নিয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ‘লোকাল স্পিরিচুয়াল এসেম্বিলি’ গঠন করেন। ২০০৫ সালের ওয়ার্ল্ড ক্রিশ্চিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়ার জরিপ মতে বাংলাদেশে বাহাইধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।)
ভারত থেকে ‘গুরু নানক দেব’ কর্তৃক ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদী ‘শিখধর্ম’র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘সাহিব’।
‘জীবের হিতসাধনই শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম’ এই মৌলিক প্রতিপাদ্যের প্রচারক ‘লোকনাথ ব্রম্মচারী’র আধ্যাত্মিক দর্শন ও শিক্ষা।
মানবজাতীর জন্য এতো ধর্মাবস্থার পরও প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে সুফলপ্রসূ ও মঙ্গলময় হয়নি। দেশের অর্থসম্পদ সমভাবে সকলের মধ্যে বিতরিত হয়নি। এতে করে একদল বিলাসিতায় ডুবে থাকে, আর অন্যদল ধনিক সম্প্রদায়ের শোষণে জর্জ্জরিত হয়ে অকালে মনুষত্বে জলাঞ্জলি দেয়। এরূপ মূলগত বৈষম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ সুন্দর ও সুস্থ নয়, বলতে হবে। এর প্রতিকারকল্পেই সমাজতন্ত্র-সমানাধিকারবাদ প্রভৃতির ধূয়া প্রাশ্চাত্যে উঠেছে। কি করে গতানুগতিক সমাজ-ব্যবস্থাকে সর্ব্বাঙ্গসুন্দর করা যায়, তার কোন যুক্তিযুক্ত উপায় উদ্ভাবনের জন্যই এইসব মতবাদের জন্ম। প্রত্যেক মানুষের জীবনই সফল-সুন্দর হওয়া বাঞ্চনীয়। এরূপ আদর্শ সমাজের খাঁটি স্বরূপটি কিরূপ হবে, তা’ নিয়ে রাষ্ট্র ভাবে-সমাজ ভাবে। কিন্তু যারা বাস্তবতার মুখোমুখি, নিত্য যাদের ভাবায়; তাঁরা কারো নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারেন না। কেউ কেউ নিজ থেকেই দায়িত্ব নেন। অবহেলিত-সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস যোগাতে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে, বেঁচে থাকার পথ বাতলে দিতে কুন্ঠাবোধ করেন না। এভাবে যারা স্বপ্রণদিত হয়ে সমাজসেবায় নিবেদিত ছিলেন তাঁরা ইতিহাস থেকে কখনোই হারিয়ে যাননি। এভাবেই যতটুকু সম্ভব রক্ষা পেয়ে আসছে মানব সভ্যতা।
“All changed.
changed utterly;
A terrible
beauty is born.”

Comments