মানুষ অবলুপ্তির পথে পা’ বাড়াল কবে থেকে?
⇒ আদি মানবেরা অগণিত প্রজন্ম ধরে হাজারো প্রজাতির জীবের সাথে নিজেদের আবাস ভাগাভাগি করে নিলেও বাকিদের চাইতে খুব একটা স্বতন্ত্র ছিল না। আজ থেকে দশ লাখ বছর আগে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো পশুসদৃশ প্রায় মানুষেরা (Primate) সহসা আবিষ্কার করে ফেলল যে, তাঁদের সামনে দুটো পা’ রয়েছে, তা দিয়ে হাঁটা ছাড়া আরও কিছু কাজ করা যায়। সামনের পা’ দু’টোকে হাতের মতো ব্যবহার করা যায়। এই হাত দিয়ে পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটা ছাড়াও কিছু আঁকড়ে ধরা যায়। পাথরের টুকরো চেপে ধরা যায়, গাছের ডাল চেপে ধরা যায়। ডালকে লাঠির মতো ব্যবহার করা যায়। পাথর দূরে ছুঁড়ে মারাও যায়। লাঠি দিয়ে কিছুকে আঘাত করা যায়। সেই থেকে হল শুরু। প্রায় মানুষের শুরু হল হত্যা করার খেলা। মাঠি খুঁড়ে গাছের শিকর ওপড়ে ফেলার খেলা। প্রাকৃতিক সম্পদ পাথরকেই অস্ত্র হিসেবে তৈরী করতে শুরু করেছিল প্রথমে। ওটাই ওদের হাতে ওঠে এসেছিল সকলের আগে। অস্ত্র হাতে পেয়েই মনেও এসেছিল প্রচন্ড জোর। হাতে এসেছিল আরও অধিক শক্তি, যান্ত্রিক শক্তি। সূর্যের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবীর বুকে প্রথম আত্মপ্রকাশ করল যন্ত্রপাতির। সোঁজা হয়ে হাঁটতে শিখে গিয়েছিল ততদিনে। তাদের আর তখন থেকে মুখের তীক্ষèধার ছেদনদন্তেরও দরকার পড়ল না। হাতের নুঁড়ি পাথরকেই খাবার কাটার বা থেঁতো করে দেয়ার কাজে ব্যবহার করতে লাগল। সেদিন তাদের মনেও অহঙ্কার ঢুকে গেল। তারা আর কোনও পশু নয়, আরও উন্নত প্রজাতীর কোনও প্রাণী। শ্রেষ্ঠ প্রাণী, বুদ্ধিমান প্রাণী। তখনই ওদের নাম হল হোমোসেপিয়েন্স (জ্ঞানী প্রজাতী)। আর যেদিন থেকে তারা নিজেদের জ্ঞানী প্রজাতী বলে দাবী করল সেদিন থেকেই তারা দ্রুত অবলুপ্তির পথেও পা’ বাড়াল, ভবিষ্যত ধ্বংশের জন্য বাড়িয়ে দিল নিজের পা’। তারা সত্যি-সত্যি কোনও মানুষ ছিল না, ছিল মানুষের পূর্বপুরুষ (Prehuman Anothropoids)। তাদের আবিষ্কার দ্বারা তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংশের পথ খুলে দিয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার এ্যানথ্রোপোলজি বিভাগের অধ্যাপক শেরউড ওয়াশবার্ন বলেছেন, `It was the success of the simple tools that
started the whole trend of human evolution and led to the civilization of
today'. যে অস্ত্র আমরা একদিন প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম আজ সকল কিছু তারই উত্তরাধীকার মাত্র, শুধু উন্নত সংস্করণ। মানুষের জৈবিক বিবর্তনের চেয়ে কারিগরি জ্ঞানের বিবর্তন ঘটতে লাগল অধিক দ্রুততার সঙ্গে। অর্থ, ক্ষমতা আর ভোগবিলাসকে আয়ত্ত করার তাগিদে সেই কারিগরি জ্ঞান মানুষ দু’চোখ বুজে নির্বোধের মতো, নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করতে লাগল। সব কিছুকে নিজের আয়ত্তে ও অধিকারে আনার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠল মানুষ। এই নেশার ঘোর আর কাটেনি, অতিআধুনিক পারমানবিক বোমার হুঙ্কারে কাঁপছে এখন গোটাদুনিয়া। প্রাকৃতিক কোন মহাবিপর্যয়েও বিস্ফোরিত হতে পারে মজুত ভয়ংঙ্কর বোমাগুলো, যেগুলো কয়েকবার উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে এই গ্রহটিকে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব ইতিহাসের গতিপথকে আকার দিয়েছে: (১) বৌদ্ধিক বিপ্লব; ৭০ হাজার বছর আগে যার ফলে আধুনিক মানব-ইতিহাসের সূচনা হয়। (২) কৃষিজ বিপ্লব; যা শুরু হয়েছিল ১২,০০০ বছর পূর্বে; (৩) বৈজ্ঞানিক বিপ্লব; যা মাত্র ৫০০ বছর আগে ঘটেছে, যে বিপ্লব টেনে আনতে পারে ইতিহাসের সমাপ্তি কিংবা জন্ম দিতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুর।
আপনি যদি আজ থেকে ২ মিলিয়ন বছর আগের পূর্ব আফ্রিকায় বেড়াতে যান, তাহলে কিছু পরিচিত মনুষ্য চরিত্রের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারেন, যাদের মধ্যে থাকতে পারে: শিশুকে বুকে চেপে রাখা উদ্বিগ্ন মা; কাঁদায় খেলে বেড়ানো উচ্ছৃঙ্খল ছেলেপেলে; সমাজের কর্তৃত্বে বিরক্ত মেজাজি যুবক; ক্লান্ত বুড়ো যারা একটু শান্তিতে থাকতে চায়; কোনো সুন্দরীর আকর্ষাণার্থী বুক চাপড়ে বেড়ানো পেশিবহুল পুরুষ; এবং জীবনের সব দেখে ফেলা বৃদ্ধ কর্ত্রী। এইসব আদি-মানবেরা ভালোবাসতো, খেলত, তৈরি করতো বন্ধুত্ব; আবার ক্ষমতা ও মর্যাদার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। কিন্তু শিম্পাঞ্জী, বেবুন এবং হাতিরাও তো তা-ই করতো। এসবের মাঝে অসাধারণ কিছুই ছিল না। সে যুগের পৃথিবীর কারো কাছে বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিল না যে এই প্রাগৈতিহাসিক মানবদের উত্তরসূরিরা ভবিষ্যতে কোনো একদিন চাঁদে হেঁটে বেড়াবে, বিভাজিত করবে পরমাণু, উপলব্ধি করবে জিনের সংকেত এবং লিখবে ইতিহাসের বই। এমনকি আদি মানবেরাও হয়ত নিজেদের নিয়ে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখত না। প্রাগৈতিহাসিক মানবদের সম্পর্কে যে বিষয়টি জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- এরা ছিল তাৎপর্যহীন ও গৌণ প্রাণী-গোষ্ঠী যারা তাদের প্রতিবেশে কোনো গরিলা, জোনাকিপোকা কিংবা জেলিফিশের চেয়ে খুব একটা বেশি প্রভাব রাখতে পারেনি।

Comments