জুতি’র মুখে মুতেই দিয়েছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ অধ্যক্ষ
ভারত উপ-মহাদেশের মুসলমানদের জাতীয় ভাষা আরবী, সাহিত্য ভাষা উর্দু, মাতৃভাষা বাংলা! যখন থেকে এই উপ-মহাদেশে ইংরেজী ভাষার আগমন ঘটতে থাকে তখন থেকেই এ নিয়ে সাহিত্যাঙ্গণে আলোচনা-সমালোচনা ছিল তুঙ্গে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আরবী কোন রকমে টিকে আছে; মসজিদ-মাদ্রাসায়। বহুমুখী ঘটনাচক্রে পড়ে বিদায় নিয়েছে উর্দু। বাঙলার অবস্থা হ-য-ব-র-ল। এখনো পালিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি।আর পোষাক! বাঙালীর আদি পোষাক ধুতি, এটি নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। তবে, বিতর্কের উর্ধ্বে ওঠেছিল ‘ধুতি’। ‘ধুতি’ বলেছিল, সে কোন ধর্মের পোষাক নয়; সে সুধুই বাঙালীর শ্রী বর্ধনে নিয়োজিত। যদিও এই ‘শ্রী’ (সৌন্দর্য) মুসলমানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে, শ্রী এখন ত্যাগ করতে চলেছেন হিন্দুরাও।
বাঙলা (দয়া করে বাঙলা বানান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবেন না, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান-রীতি এবং বাংলা একাডেমী প্রণীত আধুনিক বাংলা অভিধান নিয়ে প্রশ্ন আছে) হরফের প্রথম অক্ষর ‘অ’। আদর্শলিপি’র ‘অ’তে ছিল ‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো’। এখনকার শিশুপাঠ্যে দেয়া হয়েছে ‘অ’তে ‘অজগরটি আসছে তেড়ে’। ‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো’ এটি বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সমীচিন নয়! তাই হিন্দু লেখকের ‘আদর্শলিপি’ উধাও হয়ে গেছে। যদিও অনেকের গো-শালায় আদি চর্যাপদের স্থানগুলোতে এখন এটি ঠায় নিতে চলেছে।
এখন প্রশ্ন ওঠেছে ‘মুতি’ নিয়ে। মুতি’র প্রশ্নে বিভ্রান্ত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ অধ্যক্ষ কোনক্রমেই দায়ী নয়, অবশ্যই দায়ী সেই অজগরটি! যেটি জাতির উদ্দেশ্যে তেড়ে আসছে। ভয়ংকর অজগরের বিভৎস রূপটি দেখেই হয়ত তিনি ভরকে গেছেন। তাই ধুতি-জুতি-মুতি নিয়ে তালগোল পাঁকিয়ে ফেলেছেন তিনি হয়তো।
কবিতা! এটি কমবেশী সকলেই লেখেন। বোবা কুকিলও বসন্তে একটু-আধটুকু সুর তুলে। আর বাংলাদেশের খ্যাতনামা একটি কলেজের একজন স্বনামধন্য অধ্যক্ষ কবি হবেন না তা’ হতে পারে না। সময়ের বিবর্তনে কবিতার আঙ্গিক পাল্টেছে। অজান্তেই আধুনিক মানুষের সাথে ছাঁয়ার মতো মিশে গেছে উন্মুক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’। এর প্রভাবে খাতা-কলমও প্রায় কবি’র ঝোলায় ঢুকেছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু তাহের তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছিলেন
‘পরনে ধুতি,
নাম তার জুতি,
তার মুখে মুতি।’
‘ধুতি’ ‘জুতি’ পাড় পেয়েছে, ‘মুতি’র নিস্তার নেই। প্রশ্ন ওঠেছে, ধুতি পড়া জুতি’র মুখে কী ভাবে মুতে দিলেন কবি প্রফেসর আবু তাহের? ধুতি’কে যেহেতু মুসলমানগণ বিদায় দিয়েছেন, হিন্দুগণ যেহেতু ধুতি ধরে রেখেছেন, তাই ধুতি পড়া এই জুতি’র মুখে আর যাই হোক তিনি কোনক্রমেই মুতে দিতে পারেন না। জুতি’র সাথে কবি’র প্রেম যতো গভীরেই প্রোত্থিত হোক না কেন, আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি যা করেছেন (বার বার ‘মুত’ বলতে লজ্জাবোধ করছে) এর কোন অধিকার এই কবি’র নেই। যাকে ভালো বাসে তাঁর মুখে ইয়ে করা কী করে সম্ভব।
বাংলা একাডেমী প্রণীত আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘মুতি’ অর্থে ক্রিয়া বিশেষ্যে বলা হয়েছে প্রস্রাব করা। বিতর্ক সৃষ্টির পর ‘কবি প্রফেসর আবু তাহের’ তাঁর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে তিন লাইনের এই কবিতাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এতেও বিপত্তি কাটেনি তাঁর, মুক্তি মিলছে না। অবশেষে বিতর্ক এড়াতে তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন,
‘কারো কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে কিংবা কারো বিরুদ্ধাচারণ করে আমি কবিতা লিখিনি। পুরোনো স্মৃতি থেকে আমি কবিতা লিখেছি। এখানে শব্দটা জুতি হবে। জুতি আমার প্রেমিকা ছিল। আর মুতি বলতে এখানে মালাকে বোঝানো হয়েছে। আর ধুতিতো যে কেউ পরতে পারেন। এখন তা নিয়ে কেউ যদি মনে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তা নিয়ে আমার কিছুই করার নেই।’
হ্যা’ কবি’র কি-ই-বা করার থাকে। স্বভাবজাত কবি’রা নীতিতে অটল থাকেন! কবি সেখানেই’ত নিরব, যেখানে সময়ে-অসময়ে প্রেম হাতছানি দেয়। প্রেমে না পড়লে কেউ কবি হয়? প্রেম! সে নিজেই প্রকৃতির প্রতিরূপ। অবশেষে প্রেমের গোমর ফাঁস করতে বাধ্য হলেন তিনি। চাকুরি থেকে অবসরের সময় ঘনিয়ে আসছে। এই বয়সে প্রেমঘটিত কোন গোপন গোমর ফাঁস! সে’টি হয়ত দাম্পত্য জীবনে বেশী আঘাত হানবে না, যতটা আঘাত এসেছে ধুতি পড়া জুতি’র কাছ থেকে। কবি যদি ‘মুতি’র স্থলে ‘মোতি’ শব্দটি ব্যবহার করতেন তাহলে জুতি’র মুখে ‘মোতি’ই শোভা পেত। কিন্তু ‘মোতি’ হলো ‘ঝিনুকের দেহের অভ্যন্তরে টিসু-বিকারের ফলে গড়ে ওঠা ক্যালসিয়াম কার্বোনেট সমৃদ্ধ হালকা গোলাপী প্রভৃতি বর্ণের অস্বচ্ছ মসৃণ গোলাকার রত্ন বিশেষ’। তাই কবি কী জুতি’র মুখে মুতেই দিলেন? এ প্রশ্নে কবি’র খ্যাতি-পরিচিতি হয়তো খানিক বাড়বে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেলো। কিছু কবি আছেন যারা নিজের খ্যাতি বাড়াতে মাঝে মধ্যে একটু ভিন্ন পথ ধরে থাকেন, যখন তারা ভাবনার মধ্যম স্তরে অবস্থান করেন।
‘কবি প্রফেসর আবু তাহের’ এর পরও হয়তো ধুতি ধরবেন না। একমাত্র ধুতিতেই এখন যে তাঁর মুক্তি।
‘কবি প্রফেসর আবু তাহের’ এর পরও হয়তো ধুতি ধরবেন না। একমাত্র ধুতিতেই এখন যে তাঁর মুক্তি।

Comments