সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কেন এতো অসভ্য হয়ে গেছে?
গতকাল ফেসবুকে একটি নিরীহ পোস্ট দেখলাম। একজন গ্রামের মানুষ জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভালো হাসপাতাল কোনটি?" কমেন্টে ঝাঁকড়ি লেগে গেল। কেউ বললেন, "তুমি বোধহয় পৃথিবীতে নতুন এসেছো।" কেউ বললেন, "এতো বোকা মানুষ!" কেউ আবার ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে গেলেন।
আমি ভাবলাম, এই মানুষগুলো কি রাস্তায় কাউকে এভাবে কথা বলতে পারেন? নিশ্চয়ই পারবেন না। তাহলে স্ক্রিনের ওপারে এসে কেন এতো পরিবর্তন?
মুখোশের আড়ালে আসল চেহারা:
জীবনে আমরা দুটি মুখোশ পরে চলি। একটি বাস্তব জগতের, অন্যটি ভার্চুয়াল। বাস্তবে আমাদের চেহারা, গলার স্বর, চোখের দিকে তাকানো — সবকিছু দায়বদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু অনলাইনে সেই দায়বদ্ধতা নেই। একজন ড্রাইভার রাস্তায় হঠাৎ থেমে গেলে আমরা রেগে যাই। কিন্তু মুখোমুখি হলে সেই রাগ প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে। অনলাইনে সেই লজ্জার প্রাচীর ভেঙে পড়ে। মানুষ তার আসল চেহারাটা দেখায় — যেটি সে দিনের পর দিন চাপা দিয়ে রেখেছিল। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কোনো মূল্যায়ন পান না। তাঁদের কথা শোনার কেউ নেই। সোশ্যাল মিডিয়া তাঁদের একটি মঞ্চ দেয় — যেখানে তিনি "কেউ" হয়ে ওঠেন। সেই ক্ষমতাবোধ, তাঁকে অসভ্য করে তোলে। কারণ তিনি ভাবেন, "অবশেষে আমি কিছু বলতে পারছি"। অসভ্যতা অনেক সময় অপরিচিত ক্ষমতার অপব্যবহারের দিকে নিয়ে যায়। যে মানুষ বাস্তবে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে, সে ভার্চুয়াল জগতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্য অসভ্যতাকে হাতিয়ার বানায়।
মস্তিষ্ক যেভাবে প্রতারিত হয়:
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন "Online Disinhibition Effect" — অর্থাৎ অনলাইনে মানুষের নিয়ন্ত্রণমূলক শক্তি কমে যায়। প্রশ্ন কেন?
প্রথমত- আমাদের মস্তিষ্কে একটি অংশ আছে — Prefrontal Cortex। এটি আমাদের বলে, "এই কথাটি বলা উচিত নয়, কারণ সে কষ্ট পাবে।" কিন্তু যখন আমরা অনলাইনে কাউকে দেখি না, তখন মস্তিষ্কের সেই অংশ কম সক্রিয় হয়। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, চোখের পানি — এসব দেখা না গেলে, আমাদের সহানুভূতির হরমোন অক্সিটোসিন কম নিঃসরিত হয়। ফলে আমরা নিষ্ঠুর হয়ে উঠি।
দ্বিতীয়ত- ডোপামিন। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার — এগুলো মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ঝগড়া-বিতর্কিত পোস্টে বেশি এঙ্গেজমেন্ট হয়। তাই মস্তিষ্ক শিখে যায় — "অসভ্য হলে বেশি প্রতিক্রিয়া পাই।" এবং মানুষ সেই নেশায় মত্ত হয়।
তৃতীয়ত, Deindividuation। মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণা — যখন মানুষ একটি গোষ্ঠীর অংশ হয় এবং তার ব্যক্তিগত পরিচয় লুকায়, তখন সে এমন কিছু করে যা একা করতো না। সোশ্যাল মিডিয়া কমেন্ট সেকশন একটি ভার্চুয়াল গোষ্ঠী। সেখানে "জনতা" হয়ে গিয়ে মানুষ ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে যায়।
অসভ্যতা শুধু চরিত্রের দুর্বলতা নয় — এটি মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক এবং মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াও। তা বোঝা গেলে, আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।
জিহ্বা ও আঙ্গুলের যিম্মাদারি:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। আর যে ব্যক্তি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।" (বুখারি, মুসলিম)
এই শিক্ষা শুধু মুখের কথার জন্য নয় — লেখার জন্যও। কারণ, কলম (আজকের দিনে কিবোর্ড) যে কথা লেখে, সেটিও তার হিসেবের বইতে লিপিবদ্ধ হবে। আমরা যখন অনলাইনে কাউকে অপমান করি, ভুলে যাই যে সেই কথাগুলোও লিখিত হিসেবে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। স্ক্রিনের ওপারের মানুষটি যদি কাঁদে, যদি হতাশায় ডুবে যায় — সেই গুনাহের ভার আমার উপরও বর্তায়। কারণ ধর্ম শেখায়, "মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের প্রতি রহমত, দয়া ও সহানুভূতি প্রত্যাশিত।" অনলাইনেও আমরা আল্লাহর দৃষ্টিতে আছি। একটি কমেন্টও হিসেবের বাইরে নয়। ভদ্র থাকা ঈমানের অঙ্গ।
অপর"কে মানুষ হিসেবে দেখা:
ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, মানুষ তার নির্বাচন দিয়ে নিজেকে গঠন করে। যখন আমরা অনলাইনে কাউকে অসভ্যভাবে উত্তর দিই, তখন আমরা শুধু তাকে কষ্ট দিই না — নিজেদেরও একটি "অসভ্য সত্তা" হিসেবে গড়ে তুলি। জার্মান দার্শনিক কান্ট তার "প্র্যাক্টিক্যাল ক্যাটেগরিক্যাল ইমপারেটিভ" এ বলেছেন "মানুষকে কখনো শুধু একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করো না, সর্বদা একটি উদ্দেশ্য হিসেবে দেখো।" সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা অনেক সময় অন্যকে শুধু "এঙ্গেজমেন্টের উপাদান" হিসেবে দেখি — তার ব্যথা, তার গৌরব, তার মানুষ হওয়ার অধিকার আমরা ভুলে যাই।
ভারতীয় দর্শনে "অহিংসা পরমো ধর্মঃ" — অহিংসা সর্বোচ্চ ধর্ম। কিন্তু আজকাল আমরা ভাবি, হিংসা শুধু শারীরিক নয়। একটি কটূক্তি, একটি ব্যঙ্গ, একটি অপমানজনক কমেন্ট — এও মানসিক হিংসা। এও অহিংসার পরিপন্থী। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলতেন, "একমাত্র ভালো হলো জ্ঞান এবং একমাত্র মন্দ হলো অজ্ঞানতা।" অনলাইনে অসভ্যতা অনেক সময় অজ্ঞানতার ফসল। আমরা জানি না, ওই মানুষটির পেছনের গল্প। জানি না, তার লড়াই। তাই সহজেই বিচার করি। প্রতিটি মানুষ একটি সম্পূর্ণ জগৎ। তাকে ছোট করে দেখা মানে, নিজের চিন্তার জগৎকেও ছোট করা।
আমরা কী করতে পারি?
কোন কমেন্ট লেখার আগে ১০ সেকেন্ড থামুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন — "এই কথাটি কি মুখোমুখি বলতে পারতাম? যদি উত্তর 'না' হয়, তবে লিখব না।" মানুষকে কল্পনা করুন:যাকে আপনি উত্তর দিচ্ছেন, তাকে আপনার সামনে বসা মনে করুন — হয়তো তার চোখে পানি, হয়তো সে আজ হতাশ। কল্পনা করলে, কঠোরতা কমে যায়। লাইকের নেশা ছাড়ুন। আপনার মতামতের মূল্য যেন "লাইকের সংখ্যা" না হয়। সত্যিকারের মানুষ তখনই তৈরি হয়, যখন কেউ দেখছে না, তখনও সে নিজের নীতিতে অটল থাকে। টেক্সটে স্বরভঙ্গি থাকে না। অনেক সময় একটি মজা কটূক্তি মনে হয়। সরাসরি জিজ্ঞেস করুন — "তুমি কি এই অর্থে বলেছ?" তারপর উত্তর দিন। কোন বিষয়ে আপনি বেশি রেগে যান? রাজনীতি? ধর্ম? ব্যক্তিগত সমালোচনা? সেই টপিকে কমেন্ট করার আগে সতর্ক থাকুন। রাগ হলে, লেখা বন্ধ করে দিন। পরে ফিরে আসুন। কেউ যদি আপনার প্রতি অসভ্য হয়, প্রতিশোধ নেবেন না। দার্শনিক বুদ্ধ বলেছিলেন, "ক্ষমা হলো দৃঢ়তার চেয়েও শক্তিশালী।" অথবা চুপ থাকুন — যেমনটি হাদিসে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ডিটক্স নিন:প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় কতক্ষণ সময় কাটান? ৩ ঘণ্টা? ৪ ঘণ্টা? সময় কমান। বই পড়ুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। প্রকৃতির কাছে যান। অসভ্যতা অনেক সময় একাকীত্ব এবং ডিজিটাল অতিরিক্ততার ফসল। ভালো কথা ছড়িয়ে দিন। শুধু সমালোচনা নয়, প্রশংসাও করুন। কারো লেখা ভালো লাগলে বলুন। কারো প্রশ্নের উত্তর দিন সুন্দরভাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভদ্রতার একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে, কেউ তো শুরু করতে হবে। সেই শুরুর মানুষটি হতে পারেন আপনি।
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই:
দিন শেষে সবচেয়ে কঠিন মানুষের মধ্যেও একটি নরম স্থান আছে। সবচেয়ে রাগী মানুষও, যখন কেউ ভদ্রভাবে কথা বলে, তখন নিজেকে সামলে নেয়। সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী যন্ত্র। এটি পৃথিবীকে জুড়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা যদি এটিকে ঘৃণা, বিষ এবং অসভ্যতার জায়গায় পরিণত করি, তবে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। আমাদের প্রয়োজন "ডিজিটাল মানবতা"— স্ক্রিনের ওপারে যে মানুষটি আছে, তাকেও একজন মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা। ভদ্র থাকুন। অনলাইনেও মানুষ থাকুন। কারণ, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই— এটি আমার বিশ্বাস, এটি বিজ্ঞানের সত্য, এটি ধর্মের শিক্ষা এবং এটি দর্শনের ভাবনা।
লেখক:
জাকারিয়া মানিক

Comments