Jakaria Manik

Journalist | Writer | Poet

Jakaria Manik

"Humanity can transform this world into heaven — if it chooses to."

Translate posts to your language:

সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি বেতন-ভাতা!

সেবার মান বাড়বে? দুর্নীতি মুক্ত হবে? টাকা দেবে কে?

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, চলতি অক্টোবরের শেষেই নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী বাড়তি মূল বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। ভাতা আপাতত আগের হারেই চলবে। নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সিদ্ধান্তটি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য বড় একটি আর্থিক দায়।

নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে, তবে বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। সর্বশেষ বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। গত দশ বছরের মূল্যবৃদ্ধির বিচারে সমন্বয়ের যুক্তি অস্বীকার করা কঠিন।

দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী আছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সূত্রে এ অঙ্কে সামান্য ভিন্ন তথ্য এসেছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সরকারের মোট ব্যয় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। নতুন কাঠামোর বাড়তি খরচ কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বাজেটের আগে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা গিয়েছিল। বাজেট প্রস্তাবে আলাদা বরাদ্দ না রেখে অন্য খাতের থোক ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের সংরক্ষিত অর্থ থেকে সংস্থানের কথা বলা হয়। আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের খবরও এসেছে। অর্থাৎ বাড়তি দায় ৩৫ থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে, যা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

সমস্যা রাজস্বের ভিত। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ ৬.১ শতাংশ, আর ফিচের পূর্বাভাস ৩.৫ শতাংশ। সংস্থাটি রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনকেও চ্যালেঞ্জিং মনে করছে। আয় কম হলে ঋণ বাড়বে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট পড়বে। দুটির দায়ই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৫ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য চলতি অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান সীমিত, শিল্পখাত জ্বালানি-বিদ্যুতের ব্যয়চাপে ভুগছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আর প্রবাসী আয়ে প্রত্যাশিত গতি নেই বলে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় নির্দিষ্ট নয়, অথচ বাজারদরের চাপ তাঁদেরও সইতে হবে।

বেতন বাড়লেই সেবা উন্নত হয়, এমন নিশ্চয়তা নেই। বেতনের সঙ্গে কর্মমূল্যায়ন, নাগরিক সেবার সময়সীমা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা যুক্ত হওয়া দরকার। এ ধরনের সংস্কারের স্পষ্ট ঘোষণা এখনো চোখে পড়েনি। ন্যায্য বেতন দুর্নীতির প্রণোদনা কমাতে পারে, তবে একমাত্র সমাধান নয়।ন্যায্য বেতন নির্ধারণ করতে হলে ন্যায্য কাজের, ন্যায্য মন ও মানসিকতার, ন্যায্য চরিত্রের নিশচয়তা আগে প্রয়োজন। দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২৫-এ বাংলাদেশের স্কোর ২৪, আগের বছর ছিল ২৩। ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৩তম সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। টিআইবির মতে, এই সামান্য উন্নতির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব ছিল। রাষ্ট্রসংস্কারে অগ্রগতি না হওয়ায় বাস্তবে বড় পরিবর্তন আসেনি। সুতরাং বেতন বৃদ্ধিই দুর্নীতি কমাবে, এর পক্ষে এখনো প্রমাণ নেই। এর জন্য দরকার স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা, সম্পদ-বিবরণীর যাচাই ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা।

বেতন বৃদ্ধির দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সীমিত রাজস্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল সুশাসনের বাস্তবতায় এ ব্যয় তখনই ন্যায্য হবে, যখন তার বিনিময়ে সেবার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। নইলে সুবিধা পাবে একটি অংশ, আর খরচ বইবে পুরো দেশ। অর্থের উৎস, ঋণের প্রভাব ও সংস্কারের পথরেখা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা এখন সরকারের দায়িত্ব।

সূত্র: বিবিএস (মূল্যস্ফীতি), বাংলাদেশ ব্যাংক (মুদ্রানীতি), ফিচ রেটিংস, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (সিপিআই ২০২৫), অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।

লেখক: জাকারিয়া মানিক

Comments